এনআরবি ব্যাংকের এমডির পদত্যাগ
এনআরবি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মামুন মাহমুদ শাহ পদত্যাগ করেছেন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে তিনি ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত ২১ জানুয়ারি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের কাছে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। এমডি হিসেবে তার মেয়াদ ছিলো ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। অর্থাৎ মেয়াদ শেষ হওয়ার ১২ দিন আগেই তিনি দায়িত্ব ছেড়েছেন।
পদত্যাগপত্রে তিনি উল্লেক করেন, ব্যক্তিগত কারণে আমি আর এনআরবি ব্যাংকের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছি না। এজন্য ২১ জানুয়ারি থেকে আমার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করুণ। পাশাপাশি অসুস্থতাজনিত কারণে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ছুটি চেয়েছেন। চুক্তি অনুযায়ী ওই দিনই তার শেষ কর্মদিবস হওয়ার কথা ছিলো।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামুন মাহমুদ শাহ নতুন ধ্বনিকে বলেন, এনআরবি ব্যাংকে গত ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এমডি হিসেবে আমার মেয়াদ ছিলো। তার আগেই গত ২১ জানুয়ারি ব্যাংকটি থেকে আমি পদত্যাগ করেছি। ব্যক্তিগত কারণে আমি পদত্যাগ করেছি। সেখানে আমি স্বস্তিদায়ক মনে করছিলাম না, তাই পদত্যাগ করেছি।
পদত্যাগের নেপথ্যে
এনআরবি ব্যাংকের নথিপত্র অনুযায়ী, গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর অ্যালায়েন্স হাসপাতালের নামে ৫৫ কোটি টাকা চলতি মূলধন ঋণের অনুমোদন হয়। হাসপাতালটি ভাড়া ভবন থেকে পরিচালিত হয়, ঋণের বিপরীতে তেমন কোনো জামানতও নেই। ঋণটির আদায় ইতিমধ্যে অনিয়মিত হয়ে পড়েছে।
একইভাবে গত বছরের আগস্টে নতুন নিবন্ধিত হওয়া বরুণ করপোরেশনের ১৯ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন হয়। এই ঋণও নিয়মিতভাবে ফেরত পাচ্ছে না ব্যাংকটি। গত আগস্টে বেলা অ্যাগ্রো নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় চার কোটি টাকা। এই ঋণ ইতিমধ্যে অনাদায়ি হয়ে পড়েছে। এমন আরও কয়েকটি ঋণ প্রস্তাব সম্প্রতি ব্যাংকটিতে আসে, যা অনুমোদনের জন্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে চাপ দেওয়া হয়। এর জের ধরে এমডি পদত্যাগ করেন বলে ব্যাংকটির বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
২০২১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি এনআরবি ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগ দেন মামুন মাহমুদ শাহ। তাঁর মেয়াদ শেষ ছিল ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তবে গত ২১ জানুয়ারি ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া পদত্যাগপত্রে এমডি উল্লেখ করেন, ব্যক্তিগত কারণে তিনি এনআরবি ব্যাংকে মেয়াদ থাকা পর্যন্ত চাকরি করতে পারছেন না।
ব্যাংকটির অন্য একটি সূত্র জানায়, ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান ইকবাল আহমেদকে ব্যাংকের পরিচালক পদ থেকে কৌশলে সরিয়ে দেওয়ার পর নামে–বেনামে ঋণ তৈরি হওয়া শুরু হয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন ব্যাংকটির বর্তমান পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন পরিচালক। এর মধ্যে কেউ কেউ ব্যাংকটিতে পূর্ণ সময় অফিস করছেন। বর্তমান পরিচালকদের বেশির ভাগই একটি গ্রুপসংশ্লিষ্ট।
যোগাযোগ করা হলে এনআরবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহতাবুর রহমান বলেন, ‘এমডি সাহেব পায়ে ব্যথা পেয়ে অসুস্থ হয়েছেন। এ জন্য মেয়াদ শেষ হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে ব্যাংক ছেড়ে দিয়েছেন। উনি ভালো মানুষ। ব্যাংকের অনেক উন্নতি করেছেন। প্রয়োজনে আমরা আবারও তাঁকে এমডি করতে পারি।’
আর্থিক পরিস্থিতি
চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যে একমাত্র এনআরবি ব্যাংক আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ে যুক্ত হয়নি। ২০২১ সালে অনুমোদন পাওয়া ব্যাংকের কোনো কোনোটির আমানত ও ঋণের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকার ঘর ছাড়িয়ে গেলেও এনআরবি ব্যাংক সেই পথে যায়নি। ২০২১ সালে ব্যাংকটির আমানত ছিল ৪ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা, যা গত বছর শেষে বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। ২০২১ সালে ব্যাংকটির ঋণ ছিল ৪ হাজার ২৪ কোটি টাকা, যা গত বছর শেষে হয়েছে ৬ হাজার ৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩০০ কোটি টাকা বা ৫ শতাংশ।
২০১৯ সালে ব্যাংকটি নিট লোকসান করলেও ২০২১ সালে মুনাফা করে ৬৩ কোটি টাকা। যা ২০২২ সালে কিছুটা কমে হয় ৫৫ কোটি টাকা। গত বছর ব্যাংকটি ১৪৪ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করে।
২০১৯ সালে তিনি এনআরবি ব্যাংকে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) হিসেবে যোগ দেন। মামুন মাহমুদ শাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করে আইএফআইসি ব্যাংকে অবেক্ষাধীন (প্রবেশনারী) কর্মকর্তা হিসেবে তার ব্যাংকিং জীবন শুরু করেন।
৩২ বছরের বেশি কর্মজীবনে তিনি বিভিন্ন জাতীয় ও বহুজাতিক ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আইসিবি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড, ন্যাশনাল ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া তিনি ইস্টার্ণ ব্যাংক, এইচএসবিসি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ও এএনজেড গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন।