ল্যাব টেস্ট ছাড়াই ৪৩ কোটি টাকার বিল পরিশোধ ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে!
উন্নয়নকাজে ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর ল্যাবরেটরি পরীক্ষা (ল্যাব টেস্ট) না করেই এবং অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগেই ঠিকাদারদের প্রায় ৪৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন অডিট অধিদপ্তরের এক নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এ অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০০৮) লঙ্ঘন করে ২০১৮-১৯ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরের মধ্যে এসব অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিএনসিসির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহৃত সিমেন্ট, বিটুমিন, রড ও ইটের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য বাধ্যতামূলক ল্যাব টেস্ট করা হয়নি। এতে কাজের মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। নিরীক্ষা দল মোট ৪৩ কোটি ২৭ লাখ ৮৫ হাজার ৯৮৫ টাকা অনিয়মের তথ্য শনাক্ত করেছে।
এর মধ্যে ১২ কোটি ২৮ লাখ ৬২ হাজার ৭৯১ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে ল্যাব টেস্টের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার আগেই। অর্থাৎ পরীক্ষার ফলাফল নিশ্চিত হওয়ার আগেই কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারদের বিল দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে কোন ধরনের ল্যাব টেস্ট ছাড়াই সরাসরি কাজ সম্পন্ন করে ৩০ কোটি ৯৯ লাখ ২৩ হাজার ১৯৪ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে কয়েকটি বড় প্রকল্পের অনিয়মও তুলে ধরা হয়েছে। তেজগাঁও সাতরাস্তা মোড় থেকে উত্তরার হাউজ বিল্ডিং পর্যন্ত ১১টি ইউটার্ন নির্মাণ প্রকল্পে বিটুমিনের ল্যাব টেস্ট ছাড়াই ১০ কোটি ৩৫ লাখ ৪১ হাজার ৭৯০ টাকা মূল্যের কাজ সম্পন্ন করা হয়। এই প্রকল্পের দায়িত্বে ছিল মেসার্স এসএম কনস্ট্রাকশন ও ন্যাশনাল কনস্ট্রাকশন (জেভি)।
এ ছাড়া মিরপুরের কচুক্ষেত সড়কে তামান্না কমপ্লেক্সের সামনে ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণে ব্যবহৃত রড, সিমেন্ট ও ইটের কোনো ল্যাব টেস্ট করা হয়নি। প্রকল্পটির চুক্তিমূল্য ছিল ১ কোটি ২১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৩৮ টাকা।
আগারগাঁও প্রশাসনিক এলাকায় নির্বাচন ভবনের সংলগ্ন সড়ক ও রোড মিডিয়ান উন্নয়ন প্রকল্পেও একই ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেছে। ল্যাব টেস্টের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ছাড়াই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স জনি এন্টারপ্রাইজকে ১০ কোটি ৫১ লাখ ৮৩ হাজার ৪০৩ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
অডিটে আরও বলা হয়েছে, ডিএনসিসির অঞ্চল-১, অঞ্চল-২, অঞ্চল-৩ ও অঞ্চল-৪-এর আওতাধীন কুড়িল, কুড়াতলী, মিরপুর সেকশন-২ এবং বারিধারা এলাকার বিভিন্ন সড়ক ও নর্দমা উন্নয়ন প্রকল্পেও বিটুমিন ও সিমেন্টের ল্যাব টেস্ট ছাড়াই কোটি কোটি টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
অডিট আপত্তির জবাবে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন জানিয়েছে, মাঠপর্যায়ে নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান যাচাই করে কাজ শুরু করা হয়েছিল এবং বিটুমিন প্ল্যান্ট থেকেই পরীক্ষা করা হয়েছিল। তাদের দাবি, পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক ছিল।
তবে নিরীক্ষা দল ডিএনসিসির এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংস্থাটি তাদের দাবির পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য দালিলিক প্রমাণ বা ল্যাব টেস্ট সার্টিফিকেট উপস্থাপন করতে পারেনি। ফলে তাদের জবাবকে গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছে অডিট অধিদপ্তর।
স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন অডিট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শেখ মোহাম্মদ ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ডিএনসিসির মেয়র ও সিনিয়র সচিবের কাছে একাধিকবার তাগিদপত্র এবং আধা-সরকারি (ডিও) চিঠি পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে অডিট অধিদপ্তর। পাশাপাশি ভবিষ্যতে উন্নয়ন প্রকল্পে নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক ল্যাব টেস্ট এবং কার্যকর নজরদারি জোরদারের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।