এক বছরে শিল্প খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে লাখ কোটি টাকার বেশি
- ২০২৪ সালে ছিল ১৭১৩০৪ কোটি টাকা
- ২০২৫ সালে ২৭০২০৯ কোটি টাকা
ব্যাংক খাতের ক্যান্সার হিসেবে পরিচিত খেলাপি ঋণ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের উৎপাদনমুখী সব শিল্প খাতে। ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেক তথা ৪৮ দশমিক ৫১ শতাংশ রয়েছে পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া, জাহাজ নির্মাণসহ উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন-২০২৫ পর্যালোচনায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাড়িয়েছে ১৮ লাখ ২০ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৩২ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৪৩ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা। বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছিল ১ লাখ ৭১ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ। আর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাড়িয়েছে ৯ লাখ ৩৪ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার ২০৯ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরে শিল্প খাতের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ৯০৫ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শিল্প খাতে ঋণ বিতরণে যথাযথ নিয়ম মানা হয় না। ঘুরেফিরে ঋণ পায় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় ব্যাংকের টাকা ফেরত দেয় না। আবার কেউ কেউ নামে-বেনামে ব্যাংক থেকে টাকা বের করে বিদেশে পাচার করছে। সাধারণত এসব টাকা আর ফেরত আসে না। ফলে এই খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে।
আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন অনুযায়ী, উৎপাদনশীল শিল্পের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ হয়েছে তৈরি পোশাক খাতে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এই খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাড়িয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে ৫৯ হাজার ৪৬৪ কোটি, যা ১০ দশমিক ৬৮ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এই খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪৮ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা, যা ১৪ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। সে হিসাবে এক বছরে এই খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার ৮২৬ কোটি টাকা।
প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে টেক্সটাইল খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা। বিতরণকৃত এই ঋণের মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৪৩ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা, যা ৭ দশমিক ৮১ শতাংশ ।
আর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এই খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৬ হাজার ৫২০ কোটি টাকা, যা ১০ দশমিক ৫৪ শতাংশ। সে হিসাবে টেক্সটাইল খাতে এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা।
তথ্য মতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে বিতরণকৃ ঋণের পরিমাণ দাড়িয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা, যা ২৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৮ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা বা ২৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। সেই হিসাবে এক বছরে ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৬ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা।
প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে চামড়া খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাড়িয়েছে ১৪ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে ৬ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা, যা ১ দশমিক ১৪ শতাংশ। আর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এই খাতের খেলাপি ঋণ ছিল ৫ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরে চামড়াশিল্পে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৫৫৭ কোটি টাকা।
অন্যদিকে জাহাজ নির্মাণ শিল্পে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৭ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা, যা ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ। আর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এই খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৩১ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরে এই খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪৮১ কোটি টাকা।
প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে কৃষিভিত্তিক শিল্প খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ দাড়িয়েছে ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ৬০ হাজার ৮০৯ কোটি টাকা। আর ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে কৃষিভিত্তিক শিল্প খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে কৃষিভিত্তিক শিল্প খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪৩ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা।