ভুয়া নথি ও ব্যাক-ডেটেড চিঠির ছক: এস আলমের গোপন ইমেইল ফাইলের নথি প্রকাশ
বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের অজুহাতে চুক্তি বাতিল, ব্যাংক থেকে ভুয়া ও আগের তারিখের (ব্যাক-ডেটেড) প্রত্যাখাতপত্র জোগাড় এবং আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে ভুয়া তথ্য প্রমাণের চেষ্টা—এসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয়েছিল চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের একটি বড় ব্যবসা।
২০২৩ সালের ২২ জুন সিঙ্গাপুরভিত্তিক ট্রেড কো-অর্ডিনেটর বাণী দুরাইরাজের কাছে এস আলম গ্রুপের আইনজীবীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুরোধ আসে। সিঙ্গাপুরের আইন প্রতিষ্ঠান রাজা অ্যান্ড তান (Rajah & Tann) জানতে চায়, যদি এডিএম (ADM) থেকে সয়াবিন তেলের দুটি চালানের জন্য এস আলম এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খুলতে না পেরে থাকে, তাহলে সেই চেষ্টার প্রমাণ হিসেবে ব্যাংকের চিঠি কোথায়। তবে পুরোনো নথি খুঁজে বের করার পরিবর্তে দুরাইরাজ বাংলাদেশে থাকা দুই সহকর্মীকে ইমেইল করে লেখেন, "যদি সম্ভব হয়", ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ (IBBL) ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (SIBL)-এর নিয়মিত ফরম্যাটে আগের তারিখের (ব্যাক-ডেটেড) চিঠি সংগ্রহ বা তৈরি করতে।
এরপর একটি খসড়া বা টেমপ্লেট পাঠানো হয়, যেখানে ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে মোট ১০টি চিঠি তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়। এসব চিঠিতে দেখানোর পরিকল্পনা ছিল যে, এস আলম ব্যাংক দুটির কাছে এলসি নিশ্চিত করার অনুরোধ করেছিল, কিন্তু ঋণসীমা না থাকার কারণে ব্যাংকগুলো তা প্রত্যাখ্যান করে। ইমেইলে আরও বলা হয়, তারিখ যেন সরকারি বা ব্যাংক ছুটির দিনে না পড়ে এবং দুই ব্যাংকের চিঠি যেন ভিন্ন ভাষা ও ফরম্যাটে তৈরি করা হয়। তবে কোথাও আগের কোনো আসল চিঠি সংযুক্ত ছিল না; বরং নতুন করে এসব নথি তৈরির নির্দেশনাই দেখা যায়।
এই ঘটনার পেছনে ছিল ২০২২ সালের শেষ দিকে এডিএমের সঙ্গে করা প্রায় ৪ কোটি ৯০ লাখ ডলারের অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানির চুক্তি। চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ হওয়ার কথা ছিল নিশ্চিতকৃত (কনফার্মড) এলসির মাধ্যমে। কিন্তু এলসি আর খোলা হয়নি। এস আলমের দাবি ছিল, তারা ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খুলতে চেয়েছিল এবং এডিএমের নিশ্চিতকরণের অপেক্ষায় ছিল। অন্যদিকে, এডিএম জানায়, তারা এই দুই ব্যাংকের এলসি গ্রহণ করবে না এবং তাদের অনুমোদিত অন্য কোনো ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি পাঠাতে হবে। শেষ পর্যন্ত সমাধান না হওয়ায় চুক্তি বাতিল হয় এবং এডিএম প্রায় ৪৫ লাখ ৭০ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করে।
বিরোধটি পরে আন্তর্জাতিক সালিশি সংস্থা FOSFA-তে গড়ায়। সেখানে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে এস আলম পাল্টা দাবি করার প্রস্তুতি শুরু করে। তাদের যুক্তি ছিল, এডিএমের সঙ্গে চুক্তি ভেঙে যাওয়ায় রাজশাহীর শিমুল এন্টারপ্রাইজ ও নাবিল গ্রেইন ক্রপস লিমিটেডের সঙ্গে করা পুনর্বিক্রয় চুক্তিও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি এবং এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ইমেইলে দেখা যায়, ২০২৩ সালের জুনে এই দুই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তির নতুন সংস্করণ তৈরি করা হয়। পুরোনো ও নতুন চুক্তির তারিখ, নম্বর, স্বাক্ষর ও সিল একই থাকলেও দামের বড় পার্থক্য ছিল। নতুন সংস্করণে মোট মূল্য প্রায় ৬৮ লাখ ডলার কমানো হয়। আইনজীবীরা বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলে এস আলম জানায়, এটি একটি প্রশাসনিক ভুল ছিল এবং ভুল দামের চুক্তি একই দিন সংশোধন করা হয়েছিল।
ইমেইল ফাইলে "Hints provided by Lawyer in email" শিরোনামের একটি ওয়ার্ড ফাইলও পাওয়া যায়। এতে আইনজীবীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে কী ধরনের নথি প্রয়োজন, তার তালিকা ছিল। সেখানে জানুয়ারি থেকে মার্চ ২০২৩ সালের বিভিন্ন তারিখ দিয়ে পাম তেল সরবরাহের প্রস্তাব, সেই প্রস্তাব গ্রহণের চিঠি, সংশোধিত বিক্রয়চুক্তি, ধন্যবাদপত্র, সংশোধিত দাবি এবং খরচের বিবরণী তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়। প্রতিটি নথিই আইনজীবীদের তোলা কোনো না কোনো প্রশ্নের উত্তর হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল।
ইমেইলগুলোতে আরও দেখা যায়, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা সংকট নিয়ে প্রকাশিত সংবাদপত্রের প্রতিবেদন আইনজীবীদের কাছে পাঠানোর আগে সেগুলো থেকে এস আলমের বিরুদ্ধে যেতে পারে এমন অংশ বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন সার্কুলারও সংগ্রহ করা হয়েছিল, যাতে বাজারে প্রকৃত সংকট ছিল—এমন যুক্তি উপস্থাপন করা যায়।
নথিতে উল্লেখ থাকা শিমুল এন্টারপ্রাইজ ও নাবিল গ্রেইন ক্রপস লিমিটেডের নিবন্ধিত ঠিকানাও একই—রাজশাহীর ১৫/২ আহমেদনগর, সপুরা। এস আলমের অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, এই দুই প্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে প্রায় ৩৭ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করে এবং সেই দাবিকেও সালিশি মামলায় প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা ছিল।
ইমেইল ফাইলে আইনজীবীদের পারিশ্রমিক পরিশোধের তথ্যও রয়েছে। সেখানে দেখা যায়, রাজা অ্যান্ড তানের বিল সরাসরি এস আলম পরিশোধ করেনি। বরং সিঙ্গাপুরভিত্তিক Wilkinson International Pte Ltd এবং Donway International Pte Ltd নামে দুটি প্রতিষ্ঠান সেই অর্থ পরিশোধ করে। তবে এই দুটি প্রতিষ্ঠান কেন এস আলমের আইনি ব্যয় বহন করেছিল, তার কোনো ব্যাখ্যা নথিতে পাওয়া যায়নি।
২০২৩ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় বাণী দুরাইরাজ সহকর্মীদের লিখেছিলেন, চেয়ারম্যানের নির্দেশ অনুযায়ী ২৭ নভেম্বরের মধ্যে এডিএম ও FOSFA-এর কাছে সালিশি নোটিশ পাঠাতে হবে। কয়েক দিন পর আরেকটি ইমেইলে তিনি স্বীকার করেন, পাল্টা দাবির পক্ষে যে নথিপত্র আইনজীবীদের দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে তিনি পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। তাঁর মতে, শক্ত ও নিরপেক্ষ প্রমাণের অভাবে মামলায় বড় ধরনের দুর্বলতা থাকতে পারে। বিশেষ করে, এডিএমের সঙ্গে চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর কেন অন্য কোথাও থেকে বিকল্প সয়াবিন তেল কেনা হয়নি—এই প্রশ্নের জবাবও তাঁর কাছে দুর্বল মনে হয়েছিল।
তবে এই ইমেইল ফাইলেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এতে ব্যাক-ডেটেড নথি তৈরির অনুরোধ, নতুন নথি প্রস্তুতের পরিকল্পনা এবং ক্ষতিপূরণ দাবির কৌশল স্পষ্টভাবে উঠে এলেও শেষ পর্যন্ত সেই ব্যাংক চিঠিগুলো সত্যিই তৈরি হয়েছিল কি না, সংশোধিত চুক্তিগুলো সালিশিতে জমা দেওয়া হয়েছিল কি না বা ২৭ নভেম্বরের মধ্যে সালিশি নোটিশ পাঠানো হয়েছিল কি না—তার প্রমাণ এই নথিতে নেই। কারণ সংগৃহীত ইমেইলগুলোর তথ্য ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। একই সঙ্গে নথিগুলো থেকে এটিও নিশ্চিত হওয়া যায় না যে বাণী দুরাইরাজ এসব সিদ্ধান্তের মূল গ্রহণকারী ছিলেন। বরং তিনি একজন সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করেছেন, যিনি ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনার নির্দেশনা বিভিন্ন পক্ষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় নথি আদান-প্রদান করেছেন।