বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন
মূল্যস্ফীতি কমলেও ঋণ প্রবৃদ্ধি ধীর, রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে ইতিবাচক ধারা
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পাক্ষিক প্রধান অর্থনৈতিক সূচক প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতির একটি মিশ্র চিত্র উঠে এসেছে। একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এখনও দুর্বল এবং সরকারি ঋণ দ্রুত বাড়ছে। ১৫ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচকের হালনাগাদ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাস শেষে দেশের ব্যাপক মুদ্রা (ব্রড মানি) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেড়ে ২৩ লাখ ৯১ হাজার ৬৬ কোটি ৭০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির প্রধান উৎস হিসেবে নিট অভ্যন্তরীণ সম্পদের (এনডিএ) প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে ব্যাপক মুদ্রা বেড়েছে ২ লাখ ১৬ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
অভ্যন্তরীণ ঋণও মে মাস শেষে বার্ষিক ভিত্তিতে ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেড়ে ২৪ লাখ ৫৪ হাজার ৯৬৫ কোটি ৯০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ প্রবৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল সরকারের ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধি। একই সময়ে সরকারি খাতে ঋণ ২০ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়ে ৬ লাখ ২৯ হাজার ৫৪৬ কোটি ২০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। কর রাজস্ব আদায়ের নিম্ন প্রবৃদ্ধি, ঋণ পরিশোধের বাড়তি ব্যয় এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিজনিত অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় মেটাতে অধিক ঋণ গ্রহণ করায় এই বৃদ্ধি ঘটেছে। জুলাই থেকে মে সময়ে সরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে ৯২ হাজার ৮৮০ কোটি ৩০ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি এখনও দুর্বল রয়েছে। মে মাস শেষে এ খাতে ঋণ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ বেড়ে ১৮ লাখ ২৫ হাজার ৪১৯ কোটি ৭০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে বেসরকারি খাতে নতুন ঋণ বেড়েছে ৭৭ হাজার ৭৩২ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কম।
ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানতের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। মে মাস শেষে ব্যাংক আমানত বার্ষিক ভিত্তিতে ১১ দশমিক ৪১ শতাংশ বেড়ে ২০ লাখ ৪১ হাজার ৬৯২ কোটি ৭০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, মূলত মেয়াদি আমানত বৃদ্ধির কারণেই এই প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নতুন আমানত বেড়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫২২ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
রিজার্ভ মানি ১৫ জুলাই পর্যন্ত আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেড়ে ৪ লাখ ৬৭ হাজার ৫৭৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিট বৈদেশিক সম্পদ বৃদ্ধির কারণে এ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে নতুন অর্থবছরের প্রথম ১৫ দিনে রিজার্ভ মানি ৮ হাজার ১২৮ কোটি ৫১ লাখ টাকা কমেছে, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে তা বেড়েছিল।
মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যালোচনা সময়ে পলিসি রেট বা রেপো সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। তবে আগামী ২ আগস্ট থেকে নতুন করে রেপো রেট ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ শতাংশ কার্যকর হবে। স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) হার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রয়েছে। ১৫ জুলাই পর্যন্ত ওয়েটেড এভারেজ কল মানি রেট ছিল ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ, যা পলিসি রেটের নিচে অবস্থান করেছে।
নতুন অর্থবছরের প্রথম ১৫ দিনে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৯৯০ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায়েও উন্নতি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত সময়ে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা কর আদায় হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ০২ শতাংশ বেশি। তবে এটি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ৮১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। শুধু মে মাসে কর আদায়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
বৈদেশিক খাতে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় মাত্র শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ বেড়ে ৪৮ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। তৈরি পোশাক রপ্তানি শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ কমে যাওয়ায় সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি সীমিত হয়েছে। মোট রপ্তানির ৮০ দশমিক ৫৪ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে।
অন্যদিকে জুলাই থেকে মে পর্যন্ত কাস্টমসভিত্তিক আমদানি ৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেড়ে ৬৭ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলা ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ বাড়লেও এলসি নিষ্পত্তি ২ দশমিক ২৬ শতাংশ কমেছে।
প্রবাসী আয়ের প্রবাহে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। নতুন অর্থবছরের প্রথম ১৫ দিনে দেশে ১ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ দশমিক ১৬ শতাংশ বেশি। রেমিট্যান্স বৃদ্ধির কারণে চলতি হিসাবের ঘাটতিও কমে এসেছে। জুলাই থেকে মে পর্যন্ত চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে ৩০ কোটি মার্কিন ডলারে নেমেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৭৮ কোটি মার্কিন ডলার।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই যেখানে মোট রিজার্ভ ছিল ২৯ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখানে ২০২৬ সালের একই দিনে তা বেড়ে ৩৬ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার ক্রয় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।
বিনিময় হারেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। নতুন অর্থবছরের প্রথমার্ধে আন্তঃব্যাংক বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার গড় বিনিময় হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ০৫ শতাংশ অবমূল্যায়িত হয়ে প্রতি ডলার ১২২ টাকা ৯৫ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।
মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তির ইঙ্গিত মিলেছে। জুন মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি মে মাসের ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ থেকে কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে এটি এখনও আগের বছরের জুন মাসের ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশের চেয়ে বেশি। একই সময়ে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি সামান্য বেড়ে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে নিম্নমুখী থাকার পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ায় ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতির নিম্নমুখী প্রবণতায় সাময়িক পরিবর্তন এসেছে। তবে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত থাকায় ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।