খেলাপি ঋণ ৩২.৭ শতাংশে
আমানত বাড়লেও বড় ঝুঁকিতে দেশের ব্যাংক খাত
সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত ছোট ছোট সঞ্চয়ে ব্যাংকের আমানতের ঝুলি ভারী হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই টাকার এক বড় অংশই হারিয়ে যাচ্ছে খেলাপির অতল গহ্বরে। ব্যাংকে রক্ষিত টাকা নিরাপদ মনে করে সাধারণ মানুষ জমানো টাকা জমা রাখলেও, বড় বড় ঋণগ্রহীতাদের খেলাপি হওয়ার প্রবণতা ব্যাংকিং খাতের স্বাভাবিক গতি থমকে দিয়েছে। আমানতের ইতিবাচক খবরের আড়ালে খেলাপি ঋণের এই ভয়াবহ বিস্ফোরণকে এখন ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবেষকরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের 'ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট: মার্চ ২০২৬' শীর্ষক সর্বশেষ প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক নানা অনিশ্চয়তা এবং মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত মুনাফা কম থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকের নিরাপত্তাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন সাধারণ সঞ্চয়কারীরা। ২০২৫ সালের মার্চে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ১৯ লাখ ২৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা ২০২৬ সালের মার্চ শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৫৮ হাজার কোটি টাকায়। মোট আমানতের একটি বড় অংশ বা ৮৩ শতাংশই এসেছে বেসরকারি খাত থেকে, যার মধ্যে এককভাবে সাধারণ গৃহস্থালি বা ব্যক্তিশ্রেণীর সঞ্চয়ের পরিমাণই ১২ লাখ ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। বাকি ১৭ শতাংশ আমানত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাধারণ ও মধ্যবিত্ত গ্রাহকদের ছোট ছোট আমানত ব্যাংকে জমা পড়ছে বেশি। ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ছোট ছোট হিসাবগুলোতে জমানো টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়। বেসরকারি প্রথম প্রজন্মের ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে থেকে ২৭ শতাংশ বাজার ধরে রাখলেও, নতুন প্রতিষ্ঠিত পঞ্চম প্রজন্মের ব্যাংকগুলোতে আমানত বৃদ্ধির হার ছিল সবচেয়ে বেশি।
আমানত বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের পরিমাণও কিছুটা বেড়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকায়। ব্যাংকগুলো তাদের মোট ঋণের ৪৫ শতাংশ শিল্প খাতে এবং ৩২ শতাংশ ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে বিতরণ করেছে। এ ছাড়া কনজিউমার ফাইন্যান্সে ৯ শতাংশ, নির্মাণ খাতে ৭ শতাংশ এবং কৃষি ও বনায়ন খাতে ৪ শতাংশ ঋণ গেছে। ঋণ বিতরণে প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংকগুলো বড় ভূমিকা রাখলেও আন্তর্জাতিক বাজার ও দেশের সার্বিক ঝুঁকি বিবেচনা করে বিদেশী ব্যাংকগুলো তাদের ঋণ বিতরণ প্রায় ১০.৯ শতাংশ কমিয়ে এনেছে।
তবে আমানতের ইতিবাচক খবরের বিপরীতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে অনিয়ন্ত্রিত খেলাপি ঋণ। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২৪.৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৩১.২ শতাংশ এবং ২০২৬ সালের মার্চে এসে রেকর্ড ৩২.৭ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশেষ করে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮.৪ শতাংশ এবং চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোতে তা ৫২.২ শতাংশে ঠেকেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেও এই হার ৪২ শতাংশ। অন্যদিকে কড়া নজরদারির কারণে বিদেশী ব্যাংকগুলোর খেলাপির হার মাত্র ৬.৩ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
খেলাপি ঋণের ভেতরের চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৫০ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের বড় বড় ঋণগুলোর ক্ষেত্রে খেলাপির হার ৪২.৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, বড় এই খেলাপি ঋণের পেছনের মূল দায়ী 'ইচ্ছাকৃত খেলাপি' এবং বড় বড় কর্পোরেট গ্রুপগুলো। অপরপক্ষে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ক্ষুদ্র খেলাপি হিসাবের সংখ্যা এক বছরে ২১.৬৩ লাখ থেকে লাফিয়ে ৪৫.৪৩ লাখে পৌঁছেছে। জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দার কারণে সাধারণ মানুষের ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা কমে যাওয়াকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। শিল্পের স্কেল বিচারে বৃহৎ শিল্পেই মোট ঋণের ৫৮.৭ শতাংশ আটকা এবং সেখানে খেলাপির হার ৩৯.১ শতাংশ। তবে শতক হিসেবে সবচেয়ে কষ্টে আছে কুটির শিল্প খাত, যেখানে খেলাপির হার সর্বোচ্চ ৫২.৮ শতাংশ।
প্রতিবেদনে নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি একটি আশার আলো হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ব্যাংকের মোট গৃহস্থালি আমানত হিসাবের ৩৮.৬ শতাংশই নারীদের, যেখানে তাদের জমানো টাকার পরিমাণ ৪ লাখ ৭ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। তবে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে নারীরা এখনো কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে; মোট ঋণগ্রহীতার মাত্র ১৮.৪ শতাংশ নারী। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোতে ঋণ-আমানত অনুপাত (ADR) গড়ে ৮২.৭ শতাংশে নেমে এলেও ইসলামী ব্যাংকগুলোতে তা ১২০.৩ শতাংশ এবং চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকগুলোতে ১০১.৬ শতাংশে রয়েছে, যা এসব ব্যাংকের অতিরিক্ত ঋণ দেওয়ার বিপজ্জনক প্রবণতাকে নির্দেশ করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, আমানতের ধারাবাহিক বৃদ্ধি ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ব্যাংকিং খাতের ইতিবাচক দিক হলেও খেলাপি ঋণের এই লাগামহীন বৃদ্ধি পুরো খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। ব্যাংকিং খাতকে সম্ভাব্য বড় বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে এখনই কঠোরভাবে খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ বিতরণে এডিআর (ADR) এর নিয়ম মেনে চলা এবং আমানতকারী ও ব্যবসায়ী উভয়ের স্বার্থ রক্ষায় সুদের হারের ভারসাম্য বজায় রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।