দেশে রেকর্ড ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক
  প্রকাশিতঃ রাত ১০:৩২, বুধবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২৫, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪৩২
ফাইল ফটো
ফাইল ফটো

দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল তদারকি ও ঋণ পুনর্গঠনের নামে শিথিল নীতির কারণে ব্যাংক খাতের প্রকৃত ঝুঁকি এখন প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর খেলাপি ঋণের বাস্তব চিত্র প্রকাশ পেতে শুরু করে। মাত্র তিন মাসেই খেলাপি বেড়েছে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। জুন শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৬ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট বিতরণকৃত ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা, যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি এখন অনাদায়ী।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানান, খেলাপি গণনার নীতিমালা পরিবর্তন করায় সংখ্যাটি বেড়েছে। পাশাপাশি সরকার পরিবর্তনের সময় যেসব ব্যবসায়ী দেশ ছেড়ে চলে গেছেন, তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোও খেলাপি তালিকাভুক্ত হয়েছে। তিনি বলেন, খেলাপি কমানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যার প্রভাব ডিসেম্বর থেকেই দেখা যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কঠোর নজরদারি শুরু হওয়ায় দীর্ঘদিন ‘নিয়মিত’ দেখানো বহু ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বর্তমানে মন্দ ঋণ বা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ফলে আগের সরকারের সময় দেওয়া বিপুল পরিমাণ অনিয়মিত ঋণের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোই সবচেয়ে বেশি চাপে— যেখানে প্রায় অর্ধেক ঋণই অনাদায়ী।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগের সরকারের সময় নামে–বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাট হয়েছে, যার বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। নিয়মনীতি কঠোর হওয়ায় এখন সেই ঋণগুলো খেলাপি হিসেবে ধরা পড়ছে। ফলে এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিশ্লেষক আরফান আলী বলেন, আগের সরকার খেলাপি কম দেখাতে খারাপ ঋণের তথ্য গোপন করতে উৎসাহিত করেছিল। বর্তমান সরকার প্রকৃত তথ্য প্রকাশ করায় এখন খেলাপি বাস্তব মাত্রায় দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের মূল সমস্যা হলো স্বল্পমেয়াদি আমানত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়ার প্রবণতা। এই নীতি পরিবর্তন না করলে সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। পাশাপাশি পুঁজিবাজার শক্তিশালী করাও জরুরি।

এদিকে, আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী ২০২৬ সালের মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশ এবং সরকারি ব্যাংকে ১০ শতাংশে নামাতে হবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এ লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

২০০৯ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। এরপর থেকে তা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে— ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, লুটপাট ও অনিয়মের বাস্তব চিত্র এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
 

Share This Article