সম্মিলিত ব্যাংকের আমানত সুরক্ষা স্কিম ঘোষণা

আমানতকারীরা নিতে পারবেন বিনিয়োগ সুবিধাও

  নিজস্ব প্রতিবেদক
  প্রকাশিতঃ রাত ০৯:১১, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১৫ পৌষ ১৪৩২
লোগো
লোগো


সংকটে পড়া পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ সুরক্ষায় একাধিক ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমানত পুরোপুরি নিরাপদ থাকবে, দুই লাখ টাকা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক সুরক্ষা মিলবে এবং প্রয়োজন হলে টাকা তোলার সুযোগ থাকবে। লেনদেন চলবে স্বাভাবিক নিয়মে, স্থায়ী আমানত অক্ষুণ্ন থাকবে এবং বাজারভিত্তিক মুনাফা পাওয়া যাবে। এছাড়া আমানতের বিপরীতে ২০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ সুবিধা নিতে পারবে আমানতকারীরা। সব কার্যক্রম চলছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে।
সুশাসনের ঘাটতি, অনিয়ম ও জালিয়াতির কারণে এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংকে আমানত, মূলধন ও সম্পদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। এসব ব্যাংকের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় গত এক বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তারল্য সহায়তা দিলেও কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি।
এ অবস্থায় আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী পাঁচটি ব্যাংককে রেজল্যুশনের আওতায় আনা হয়। সার্বিক তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনার জন্য ৫ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রতিটি ব্যাংকে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।
রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সম্প্রতি লাইসেন্সপ্রাপ্ত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কাছে সংশ্লিষ্ট পাঁচটি ব্যাংকের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ, দায় এবং বিদ্যমান চুক্তিসমূহ আইনগতভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার সরাসরি ২০ হাজার কোটি টাকা প্রদান করেছে। অবশিষ্ট ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানির স্থায়ী আমানত এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকে শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে মূলধনে রূপান্তর করা হবে। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, প্রভিডেন্ট ফান্ড, যৌথ উদ্যোগ, বহুজাতিক কোম্পানি ও বিদেশি দূতাবাস এ বিধানের বাইরে থাকবে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী পাঁচটি ব্যাংকের সব চলতি, সঞ্চয়ী ও স্থায়ী আমানত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে স্থানান্তরিত হয়েছে। অধ্যাদেশ অনুসারে আমানতকারীদের দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে এবং প্রাথমিকভাবে উত্তোলনের সুবিধা দেওয়া হবে। এ উদ্দেশ্যে আমানত সুরক্ষা তহবিল থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে। কোনো গ্রাহক এ অর্থ উত্তোলন না করলে তিনি তাঁর স্থিতির ওপর বাজারভিত্তিক মুনাফা পাবেন।
রেজল্যুশন কার্যকর হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ ভিন্ন নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পূর্ববর্তী ব্যাংকের নামে ব্যবহৃত চেকবই, ডিপোজিট স্লিপ, উত্তোলন স্লিপসহ সব ব্যাংকিং দলিলকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বৈধ দলিল হিসেবে গণ্য করা হবে। নির্ধারিত মেয়াদের আগে স্থায়ী আমানত পরিশোধযোগ্য নয়। আমানতকারীরা বিদ্যমান স্থিতির বিপরীতে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ বিনিয়োগ সুবিধা নিতে পারবেন, আর নতুন আমানতের বিপরীতে বিনিয়োগের সুযোগ থাকবে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত।
এ ছাড়া অভিযোগ বা মামলা নেই—এমন সব কর্মকর্তা-কর্মচারী সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে স্থানান্তরিত হবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে পরিচালনা পর্ষদ চাকরির শর্ত পুনর্নির্ধারণ করতে পারবে। কেউ চাইলে লিখিতভাবে ইস্তফা দেওয়ার সুযোগও পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, নতুন ব্যবস্থাপনায় গ্রাহকের জমা অর্থ সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকবে এবং লেনদেন আগের মতো স্বাভাবিকভাবে চলবে। এই রেজল্যুশন প্রক্রিয়া ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফেরাতে একটি সংস্কারমূলক ও সক্রিয় পদক্ষেপ। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও গভার্ন্যান্স শক্তিশালী করার মাধ্যমে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পুরো সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, এর মাধ্যমে আমানতকারীর অর্থ সুরক্ষিত থাকবে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা দৃঢ় হবে।

Share This Article