নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন

আহমাদিনেজাদ কি ইসরায়েলের গুপ্তচর?

  আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  প্রকাশিতঃ রাত ০১:১২, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
নতুন ধ্বনি
নতুন ধ্বনি
  • ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি ও ইরানে পালাবদলের ব্যর্থ ছক: আহমাদিনেজাদের নেপথ্য কাহিনী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক গণমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন

সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্টকে নিজেদের একজন গোয়েন্দা সম্পদ (অ্যাসেট) হিসেবে গড়ে তোলার পেছনে ইসরায়েলের বছরের পর বছর ধরে চালানো গোপন প্রচেষ্টা চূড়ান্ত রূপ নেয় যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে। সে সময় তাকে উদ্ধার করে ইসরায়েলি একটি নিরাপদ আস্তানায় (সেফ হাউস) নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি নাটকীয় অভিযান চালানো হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

২০২৪ সালের শুরুর দিকে, বুদাপেস্টের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর (উপাচার্য) হাঙ্গেরি সরকারের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার কাছ থেকে একটি চমকপ্রদ অনুরোধ পান।

ওই কর্মকর্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর অধ্যাপক গেরগেলি ডেলি-কে বলেন, 'লুদোভিকা ইউনিভার্সিটি অব পাবলিক সার্ভিস'-এর উচিত জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক একটি সম্মেলনের আয়োজন করা এবং সেখানে একজন অপ্রত্যাশিত অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো। তিনি আর কেউ নন—ইসরায়েলের ঘোর বিরোধী ও একসময়ের তীব্র নিন্দিত সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ।

তবে এর চেয়েও বড় ধাক্কা ছিল এর পেছনের কারণটি। ওই সরকারি কর্মকর্তা জনাব ডেলি-কে জানান, এই সম্মেলনটি আসলে একটি অজুহাত মাত্র। এর আসল উদ্দেশ্য হলো বুদাপেস্টে আহমাদিনেজাদের সাথে তার চিরশত্রু ইসরায়েলের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একটি গোপন বৈঠকের ব্যবস্থা করা।

জনাব ডেলি জানতেন যে এই আমন্ত্রণের কারণে তার নিজের এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে। তবে পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে তিনি হয়তো মানুষের জীবন বাঁচানোর মতো কোনো বড় কাজে ভূমিকা রাখছেন।

তিনি বলেন, "আপনার যখন দুজন শত্রু থাকে এবং তারা যদি নিজেদের মধ্যে কথা বলতে চায়, তবে তাদের কথা বলানোর জন্য আপনার সাধ্যমতো সবকিছু করাই শ্রেয়।"

এই স্পর্শকাতর গোয়েন্দা অভিযানের বিষয়ে অবগত মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ২০২৪ সালে আহমাদিনেজাদের ওই বিশ্ববিদ্যালয় সফর এবং পরের বছর তার দ্বিতীয় সফরটি ছিল আসলে ইসরায়েলের একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ। ইসরায়েলের উদ্দেশ্য ছিল আহমাদিনেজাদকে নিজেদের ছায়াতলে এনে এমনভাবে প্রস্তুত করা, যাতে সময় সুযোগ বুঝে তাকে ইরানের নতুন নেতা হিসেবে ক্ষমতায় বসানো যায়।

ইসরায়েলের কাছে আহমাদিনেজাদকে হাত করা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্যমতে—ইসরায়েলের তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান ডেভিড বার্নিয়া ২০২৪ সালে আহমাদিনেজাদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করতে হাঙ্গেরির রাজধানীতে ছুটে গিয়েছিলেন। এর কিছুদিন পরেই ইসরায়েলের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-কে জানায় যে তারা আহমাদিনেজাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।

আহমাদিনেজাদকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের এই সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনাটি সত্যিই একটি নাটকীয় মোড়। কারণ এই আহমাদিনেজাদই একসময় ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়েছিলেন, প্রতিনিয়ত ইসরায়েল ধ্বংসের ডাক দিতেন এবং ইহুদি নিধনযজ্ঞ বা হোলোকাস্টকে অস্বীকার করেছিলেন।

মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল গোপনে আহমাদিনেজাদের আবাসন ও ভ্রমণ খরচের জন্য অর্থ প্রদান করেছিল। বুদাপেস্ট সফরসহ বিভিন্ন সময়ে দেশের বাইরে ইসরায়েলি এজেন্টরা তার সাথে একাধিকবার গোপন বৈঠকও করে।

এই গোপন প্রচেষ্টা চূড়ান্ত রূপ নেয় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক প্রথম দিনগুলোতে। তেহরানে কঠোর নজরদারিতে থাকা এই সাবেক নেতাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য একটি দুঃসাহসিক অভিযান চালানো হয়। লক্ষ্য ছিল বর্তমান সরকারকে উৎখাত করে আহমাদিনেজাদকে ক্ষমতায় বসানোর প্রক্রিয়া শুরু করা।

কিন্তু সেই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।

গত সপ্তাহে তেহরানে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইয়ের জানাজায় শোকগ্রস্ত মানুষের ঢল নামে।

গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি আহমাদিনেজাদের বাসভবনে একটি ইসরায়েলি বিমান হামলা হয়। এতে তার দেহরক্ষীদের ভবন এবং তার বুলেটপ্রুফ গাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইরানের চারজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, হামলার পরপরই সেখানে একটি কালো রঙের পিউজো (Peugeot) গাড়ি এসে পৌঁছায় এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মাঝখান থেকে আহমাদিনেজাদকে দ্রুত তুলে নিয়ে চলে যায়।

এই অভিযানের খবর জানা মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, গাড়িটি চালাচ্ছিলেন মোসাদের এজেন্টরা। তারা আহমাদিনেজাদকে ইরানের ভেতরেই একটি গোপন আস্তানায় নিয়ে যান।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই তাড়াহুড়ো করে উদ্ধার পাওয়ার ঘটনায় সাবেক ইরানি নেতা বেশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন এবং তাকে ক্ষমতায় ফেরানোর ইসরায়েলি পরিকল্পনা নিয়ে তার মনে মোহভঙ্গ ঘটে।

পরবর্তীতে তিনি ঠিক কীভাবে সেই নিরাপদ আস্তানা ত্যাগ করেন, তা এখনো অস্পষ্ট। এরপর থেকে গত সোমবারের আগ পর্যন্ত তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। গত সোমবার নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইয়ের জানাজার মিছিলে তাকে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দেখা যায়।

বর্তমানে তার আসল অবস্থা কী, তা নিশ্চিত নয়। তবে ইরানের চারজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইসরায়েলের সাথে আহমাদিনেজাদের গোপন যোগাযোগের সিংহভাগ তথ্য এখন ইরান সরকারের হাতে। ফলে বর্তমানে তিনি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) গোয়েন্দা শাখার হেফাজতে গৃহবন্দী অবস্থায় রয়েছেন।

তেহরানের সরকারকে উৎখাত করার এই মহাপরিকল্পনার বিষয়ে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। এই পরিকল্পনার আরেকটি অংশ ছিল উত্তর ইরাকে অবস্থানরত ইরানি কুর্দি বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তারা পশ্চিম ইরান সীমান্ত পার হয়ে দেশের ভেতরে ঢুকে নির্দিষ্ট এলাকা দখল করতে পারে এবং একপর্যায়ে রাজধানী তেহরানের দিকে অগ্রসর হয়। তবে সেই পরিকল্পনা কখনোই বাস্তবে রূপ নেয়নি।

নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ আহমাদিনেজাদের এই ভূমিকার কথা প্রথম ফাঁস হওয়ার পর, মে মাসে পিবিএস-এর টকশো "ফায়ারিং লাইন"-এ ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাবেক গোয়েন্দা প্রধান তামির হেইম্যান বলেন, "এই সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনায় অত্যন্ত অনন্য ও ধারাবাহিক কিছু বিশেষ অভিযান চালানোর কথা ছিল। আর আহমাদিনেজাদ ছিলেন সেই ধারাবাহিকারই একটি অংশ।"

মোসাদ কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। আহমাদিনেজাদের মুখপাত্র আলী আকবর জাভানফাকরও কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পরবর্তী মানসিকতার পরিবর্তন

২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন আহমাদিনেজাদ ছিলেন দেশটির সবচেয়ে কট্টরপন্থী রাজনীতিবিদ। তিনি ইসরায়েলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার কথা বলতেন। তার শাসনামলেই ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুনরায় শুরু করে, যা দেখে পশ্চিমা দেশগুলোর সন্দেহ হয় যে ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে। ২০০৯ সালে তার পুনর্নির্বাচনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গড়ে ওঠা আন্দোলন তিনি কঠোর হস্তে দমন করেছিলেন। তার সময়ে বিচার বিভাগ ঢালাওভাবে বিরোধীদের মৃত্যুদণ্ড দেয় এবং অনেককে কারাগারে বন্দি করে।

কিন্তু রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী বছরগুলোতে আহমাদিনেজাদ তার উগ্র মতামত থেকে সরে আসেন এবং ইসরায়েল-বিরোধী বক্তব্য কমিয়ে দেন। তিনি প্রায়ই নিজের একটি নরমপন্থী বা উদার রূপ দেখানোর জন্য উদগ্রীব থাকতেন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ও বক্তৃতায় তিনি ইরানের পপ মিউজিক কালচার নিয়ে কথা বলতেন, দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমনপীড়নের সমালোচনা করতেন এবং শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তুলতেন।

তিনি তার পুরনো ঢিলেঢালা খাকি উইন্ডব্রেকার জ্যাকেট পরা ছেড়ে দিয়ে দর্জির বানানো দামি স্যুট পরা শুরু করেন। অগোছালো দাড়ি ছেঁটে পরিপাটি করেন, চেহারায় বোটক্স ট্রিটমেন্ট করান এবং ইংরেজি শিখতে শুরু করেন।

তেহরানে তার কার্যালয়ে তিনি প্রতিদিন সকালে সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ শোনার জন্য ঘণ্টাঘ্যাপী উন্মুক্ত সভা করতেন। সরকারি আমলাতন্ত্রের জটিলতা কাটাতে অনেকেই তার কাছে আসতেন। মাঝে মাঝে তিনি আবেদনকারীদের ব্যাংকের ঋণের সুপারিশ করে সরকারি মন্ত্রণালয়গুলোতে চিঠিও লিখতেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে তিনি শহর ও গ্রামের সমর্থকদের সাথে নিয়মিত দেখা করতেন।

ইরান সরকারের সাথে আহমাদিনেজাদের সম্পর্ক ছিল বেশ জটিল। শীর্ষ নেতারা তাকে কোণঠাসা করে রেখেছিলেন এবং তার চলাফেরা সীমিত করেছিলেন; তবুও সর্বোচ্চ নেতাকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের কাউন্সিলে তাকে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে, ফেব্রুয়ারি মাসেও তিনি সেই কাউন্সিলের বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন।

অনেকে আহমাদিনেজাদের এই পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য দেখতেন। তাদের মতে, এটি ছিল তার জনপ্রিয়তার ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার এবং বর্তমান শাসক মহলের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার একটি কৌশল। শ্রমজীবী ইরানিদের মধ্যে তার একটি বড় সমর্থক গোষ্ঠী রয়ে গিয়েছিল এবং তার উপদেষ্টারা নিশ্চিত ছিলেন যে তার লক্ষ্য ছিল একদিন আবার ক্ষমতায় ফেরা।

আহমাদিনেজাদের সাবেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও প্রবীণ উপদেষ্টা আব্দুর রেজা দাভারি একটি ফোনালাপে বলেন, "আহমাদিনেজাদ অর্থের জন্য এসব করবেন না। তার প্রচুর অর্থ ও বড় অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক আছে। তিনি যা করবেন তা ক্ষমতার জন্য। তিনি আবার ক্ষমতার শীর্ষে বসতে চান।" উল্লেখ্য, বেশ কয়েক বছর আগে এই দুই ব্যক্তির মধ্যে সম্পর্কের ফাটল ধরেছিল।

আহমাদিনেজাদের ঘনিষ্ঠ সার্কেলের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আহমাদিনেজাদ তার অল্প কয়েকজন বিশ্বস্ত সহযোগীকে বিদেশী শক্তির সহায়তায় ইরানের ভবিষ্যৎ নেতা হওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন।

ওই সহযোগী জানান, তিন তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা হারানোর পর ইসলামিক রিপাবলিক ব্যবস্থার ওপর আহমাদিনেজাদের মোহভঙ্গ হয়। তিনি বুঝতে পারেন, বর্তমান ব্যবস্থা বহাল থাকলে তিনি আর কখনো ক্ষমতায় আসতে পারবেন না।

তিনি আশঙ্কায় ছিলেন যে, যদি যুদ্ধ বা সরকার পরিবর্তন হয়, তবে আমেরিকা ও ইসরায়েল হয়তো ইরানের বাইরের কোনো প্রবাসী বিরোধী নেতাকে বেছে নেবে যিনি দেশ সম্পর্কে কিছুই জানেন না, যার ফলে ইরান অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। তিনি নিজেকে রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলতসিনের মতো একজন 'সংস্কারক' হিসেবে দেখতেন। সহযোগীদের তিনি বলতেন, তিনি ক্ষমতায় আসলে ইরান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডস'-এর আওতায় সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে।

ইসরায়েলের দুজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানান, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আহমাদিনেজাদ ও ইরানি সরকারের এই ক্রমবর্ধমান দূরত্বের বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। বিশেষ করে, আয়াতুল্লাহ খামেনেই এবং অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের প্রতি আহমাদিনেজাদের ক্ষোভের বিষয়টি ইসরায়েলিদের নজর কাড়ে, যারা তাকে বারবার নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করেছিল।

ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসের গোয়েন্দা শাখা (যা মূলত বিদেশী হস্তক্ষেপ থেকে দেশকে রক্ষা করে), তাদের মনে আহমাদিনেজাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে। গার্ডসের দুজন সদস্য এবং একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, ২০১৭ সালে আহমাদিনেজাদ যখন ট্রাম্প এবং পরে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের কাছে প্রকাশ্যে চিঠি পাঠাতে শুরু করেন, তখন থেকেই সন্দেহ আরও গভীর হয়। ট্রাম্পও সে সময় এই দুজনের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।

চলতি বছর ইসরায়েলি হামলার পর আহমাদিনেজাদ যখন গার্ডসের নজরদারি থেকে সাময়িকভাবে নিখোঁজ হন, তখন ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তদন্ত শুরু করে এবং ইসরায়েলের সাথে তার যোগাযোগের সমস্ত সূত্র জোড়া লাগাতে সক্ষম হয়।

বিদেশী মাটিতে গোপন বৈঠক

ইসরায়েলি এজেন্টরা ঠিক কবে প্রথম আহমাদিনেজাদকে নিজেদের দলে টানার চেষ্টা করেছিল তা পরিষ্কার নয়। তবে ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, ২০২৩ সালে আহমাদিনেজাদ যখন একটি পরিবেশ সম্মেলনে যোগ দিতে গুয়াতেমালা সফরে যান, তখনই প্রথম যোগাযোগ তৈরি হয়। গুয়াতেমালা সরকারের পক্ষ থেকে এই আমন্ত্রণ এসেছিল, যাদের সাথে ইসরায়েলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।

তবে আহমাদিনেজাদের এই সফরটি প্রায় বাতিল হতে বসেছিল। তেহরান বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বাহিনী তাকে আটকে দেয় এবং বোর্ডিং পাস দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

এর প্রতিবাদে তিনি বিমানবন্দরেই কয়েক ঘণ্টা ধরে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন, যা সাধারণ যাত্রী ও বিমানবন্দর কর্মীদের সাথে ছবি তোলা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভ আপডেট দেওয়ার কারণে একটি বড় জনসমক্ষে প্রদর্শিত নাটকে পরিণত হয়।

অবশেষে, ইরানি কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তাকে বিমানে ওঠার অনুমতি দেয়।

গুয়াতেমালা সফরের একটি ভিডিওতে আহমাদিনেজাদকে বলতে শোনা যায়, "কিছু মানুষ আমাকে গুয়াতেমালা যেতে নিষেধ করেছিল; আমি তাদের বলেছি আমার ভাই—সেখানকার পরিবেশ মন্ত্রী আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ল্যাটিন আমেরিকার এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ।"

এর পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে তিনি প্রথম হাঙ্গেরি সফরে যান লুদোভিকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনে যোগ দিতে। সেখানে বুদাপেস্টে তার সাথে ডেভিড বার্নিয়ার দেখা হয়, যিনি গত মাস পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ বছর মোসাদের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

হাঙ্গেরি—যার নেতৃত্বে ছিলেন ডানপন্থী প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান—ইউরোপের যেকোনো দেশের চেয়ে ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। অরবান এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একে অপরের দেশ সফর করেছিলেন। এমনকি ২০২৫ সালের এপ্রিলে নেতানিয়াহু নিজে লুদোভিকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ভাষণ দেন এবং সেখানে তাকে জনসেবামূলক কাজের জন্য একটি বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হয়।

এর ঠিক দুই মাস পর, ২০২৫ সালের জুনে, ইরানে ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে, আহমাদিনেজাদ আবার বুদাপেস্টে আসেন। এই সফরটি ছিল মূলত ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের সাথে তার বৈঠকের একটি ছদ্মবেশ বা কভার।

আহমাদিনেজাদের সব বিদেশ সফরে তার সাথে থাকা রেভল্যুশনারি গার্ডসের আনসার ইউনিটের দেহরক্ষীরা জানান, ২০২৫ সালের জুন মাসের ওই সফরে অন্তত দুইবার আহমাদিনেজাদ তার নিজস্ব নিরাপত্তা বলয় ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন। সফর শেষের প্রতিবেদনে দেহরক্ষীরা উল্লেখ করেন যে, তারা এ বিষয়ে আহমাদিনেজাদকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি দাবি করেন যে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সাথে বৈঠক করছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলনে এই সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্ট ইংরেজিতে বক্তৃতা দিয়ে উপস্থিত সবাইকে চমকে দেন। তিনি তার চিরাচরিত প্রথা ভেঙে বক্তৃতার শুরুতে কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করা থেকে বিরত থাকেন।

গাঢ় নীল রঙের স্যুট পরে তিনি "অংশীদারিত্বমূলক মানবতা" এবং "পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থা" নিয়ে কথা বলেন এবং কীভাবে একটি নতুন বিশ্ব গড়ে উঠতে পারে সে বিষয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন।

সফরকালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর জনাব ডেলি-কে প্রাচীন ইরানি কবি ফেরদৌসীর বিখ্যাত মহাকাব্য ‘শাহনামা’ (দ্য বুক অব কিংস)-এর একটি অনুলিপি উপহার দেন। বিনিময়ে জনাব ডেলি আহমাদিনেজাদকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি স্মারক প্রতীক প্রদান করেন।

গত মাসে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জনাব ডেলি স্বীকার করেন যে, আহমাদিনেজাদকে আমন্ত্রণ জানানোর ক্ষেত্রে তিনি আসলে একজন "স্ট্রোম্যান" (Strohmann - জার্মান শব্দ, যার অর্থ সম্মুখভাগের পুতুল বা ঘুঁটি) হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিলেন।

গত সপ্তাহের আগ পর্যন্ত, ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে তেহরানের বাড়ি থেকে কালো পিউজো গাড়িতে চড়ে নিখোঁজ হওয়ার পর আহমাদিনেজাদকে আর দেখা যায়নি।

অবশেষে গত সোমবার, আয়াতুল্লাহ খামেনেইয়ের জানাজার মিছিলে তাকে হঠাৎ এক ঝলক দেখা যায়। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও তার গায়ে ছিল একটি ভারী জ্যাকেট এবং মুখের সার্জিক্যাল মাস্কটি থুতনির নিচে নামানো ছিল। ইরানের অন্য দুই জীবিত সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এবং মোহাম্মদ খাতামিকে এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি এবং তারা কোথাও উপস্থিত ছিলেন না।

জানাজার মিছিলে আহমাদিনেজাদ মাথা নিচু করে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিলেন, আর তার চারপাশ ঘিরে রেখেছিল কড়া নিরাপত্তা প্রহরীরা।

Share This Article