ব্যবসায়ীদের কিছুদিন ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিলেন গভর্নর
দেশের বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতির নিয়ন্ত্রণ। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে মূল্যস্ফীতির লাগামের বিকল্প দেখছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতিতে গেছে ব্যাংক খাতের এই নিয়ন্ত্রণ সংস্থা, যার কারণে বেড়েছে ব্যাংক ঋণে সুদের হার। আর তারল্য সংকটে পড়েছে অধিকাংশ ব্যাংক। এতে নতুন করে বিনিয়োগে অনিহা দেখাচ্ছে ব্যাংকগুলো।
এমন পরিস্থিতিতে উচ্চ সুদের হারে লাগাম, ডলার সংকট নিরসন ও একক গ্রাহকের ঋণসীমা বৃদ্ধির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারের সাথে দেখা করেছেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ড্রাস্ট্রির নেতারা। এসময় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে ব্যবসায়ীদের কিছুদিন ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছেন গভর্নর। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের দাবিগুলো পুরণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। সভায় উপস্থিত থাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন শীর্ষকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ব্যাংক ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি ও তারল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছে সহযোগীতা চেয়েছেন বিসিআইয়ের নেতারা। এসময় ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ না করে বন্ডে বিনিয়োগ করছে বলেও উল্লেখ করেছেন তারা। এমন পরিস্থিতিতে ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা, ঋণের সুদের হারে বড় ধরণের পরিবর্তন না করার দাবি জানান তারা। পাশাপাশি কমিয়ে আনা রপ্তানি প্রণোদনা বৃদ্ধি, ডলার সংকটের কারণে পণ্য তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যা ও আমদানিতে ডলারের দর নিয়ন্ত্রণেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা চান তারা। পরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে ব্যবসায়ীদের কিছুদিন ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছেন গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার। আর চলতি বছরের মধ্যে ডলার সংকট কমে যাবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
গভর্নর বলেন, এই মূহুর্তে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বৃদ্ধির কোন বিকল্প নেই। তবে এটি যাতে হুট করে বেড়ে না যায় এজন্য স্মার্ট রেট ঘোষণার মাধ্যমে সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। আর ডলার সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংক এলসি পর্যবেক্ষণসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো ইতোমধ্যে কাজ করতেও শুরু করেছে। সব কিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের শেষ দিকে ডলার সংকট কেটে যাবে। আর প্রণোদনার বিষয়টি অর্থনীতিবিদ ও সরকারের সাথে আলোচনার মাধ্যমেই করা হয়েছে। এছাড়া একক গ্রাহকের ঋণসীমা বৃদ্ধির বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ড্রাস্ট্রির সভাপতি আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ডলার সংকট, ব্যাংক ঋণের সুদের হার, একক গ্রাহকের ঋণসীমাসহ কয়েকটি বিষয়ে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সাথে কথা বলেছি। তিনি বলেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এখন মূল লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা। এজন্য সবাইকেই সহযোগীতা করতে হবে। পাশাপাশি আমরা আরো কিছু বিষয়ে গভর্নরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। তিনি সমস্যাগুলো সমাধানে আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা তার আশ্বাসের উপর বিশ্বাস রাখতে চাই।
বিসিআইএর দাবিগুলো:
১. ব্যাংক খাতের সুদের হারসহ সামগ্রিক বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ।
২. শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করা ছাড়া দেশিয় শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়বে। এজন্য কাঁচামাল আমদানির এলসি যাতে নির্বিঘ্নে করা যায় সে বিষয়ে পদেক্ষেপ গ্রহণ।
৩. আমদানিতে ডলারের দর অনেক বেশি। এজন্য ডলার দর নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ।
৪. সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক রপ্তানিকারকদের দেওয়া নগদ সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে। রপ্তানি বৃদ্ধির স্বার্থে সহায়তা আরো বাড়ানো দরকার।
৫. একক গ্রাহক ঋণসীমা আগে ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের ৩৫ শতাংশ ছিলো। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা কমিয়ে ২৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো মুদ্রার অবমূল্যায়নও বিবেচনা করছে না। তাই ঋণসীমা ৩৫ শতাংশ করার দাবি।
৬. বাংলাদেশে প্রতিটি একক কোম্পানির স্বতন্ত্র পরিচয় রয়েছে। কিন্তু একজন পরিচালক একাধিক প্রতিষ্ঠানে থাকার কারণে আমরা সেটাকে গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করি। অথচ, অন্যান্য দেশে তারা কয়েকটি কোম্পানিকে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসে এবং গ্রুপ নামে নিবন্ধিত হয়। এজন্য এই গ্রুপ পরিভাষা সংশোধন এবং আন্তর্জাতিক অনুশীলন অনুসরণ করার অনুরোধ করেন তারা।