যা আছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন রোডম্যাপে
খেলাপি ঋণ কমাতে ১১ দফা রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কোনো গ্রাহক ঋণ নিয়মিত পরিশোধ না করলে তাকে ইচ্ছাকৃত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। এসব খেলাপিদের বিভিন্নি সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হবে। তারা নতুন করে জমি বাড়ি গাড়ি কিনতে পারবেন না, এমনকি নতুন ব্যবসাও খুলতে পারবেন না।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। পরিচালক পর্ষদের সভা শেষে এসব বিষয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু ফারহ নাছের।
খেলাপি কমাতে ১১ কর্মপরিকল্পনা
২০২৬ সালের মধ্যে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ৮ শতাংশে নিচে নামিয়ে আনতে মন্দঋণ অবলোপনের সময় ৩ বছর থেকে কমিয়ে ২ বছর করা হবে। এক্ষেত্রে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হবে। শতভাগ প্রভিশন রাখলে ব্যাংকে ঝুঁকি থাকবে না বলে জানায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই পদক্ষেপের কারণে খেলাপি ঋণ ৪৩ হাজার ৩০ কোটি বা ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ হ্রাস পাবে।
এছাড়া অবলোপন ঋণ আদায়ে ব্যাংক নির্বাহীদের সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ‘অবলোপনকৃত ঋণ আদায় ইউনিট’ নামে একটি পৃথক ইউনিট গঠন ও ঋণ আদায় নির্বাহীদের মূল্যয়ন যুক্ত করা হয়েছে। আর মন্দ ঋণ এবং অবলোপনকৃত সম্পদ বেসরকারি খাতে এ্যাসেস ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) নিকট বিক্রি করে ব্যাংক তাদের ব্যালেন্স শীট পরিস্কার করতে পারবে। এই অর্থ ব্যাংকের আয় খাতে জমা করতে পারবে।
খেলাপি ঋণ কমাতে অন্যতম কঠোর পদক্ষেপ হলো ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে প্রকৃত আদায় ছাড়া সুদ অথবা মুনাফা আয় খাতে নেয়া যাবে না। প্রকৃত আদয় না হওয়া পর্যন্ত আলাদা ব্যালেন্স শীটে রাখতে হবে। এর ফলে ব্যবস্থপনা কর্তৃপক্ষ নিয়মিত ঋণকে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ হতে দিবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ইতিপূর্বে ঋণ পরিশোধে বিভিন্ন ছাড় দেয়া হয়েছে। এসব ছাড়ের মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না। এতে করে ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি ফিরে আসবে এবং ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট কমে আসবে। আর ক্যাশ ফ্লো বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি পুরতান ঋণ আদায়ের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে নতুন ঋণের প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে।
অন্যদিকে মেয়াদি ঋণের মেয়াদোর্ত্তীণ হওয়ার সময় আন্তর্জাতিক চর্চায় ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সব ধরনের মেয়াদি ঋণ ওভারডিউ হওয়ার পর পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে ক্লাসিফাইড করতে হবে। যা বর্তমানে নয় মাসে করা হয়। এতে খেলাপি ঋণ কিছুটা বেড়ে যাবে বলে ধারণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
দেশের ব্যাংকগুলোর বিদ্যমান লিগ্যাল টিম অথবা আইন বিভাগকে শক্তিশালী করার কর্মপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে অর্থ ঋণ আদালতের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে আশা প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়া অর্থঋণ আদালতের পাশাপাশি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) পদ্ধতিতে আদালতের বাইরে মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হবে।
ইচ্ছকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী নীতিমাল প্রনয়ন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নীতিমালর ফলে ঋণ গ্রহীতাদের ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করার প্রবণতা হ্রাস পাবে । এ বিষয়ে ডেপুটি গভর্নর আবু ফারাহ মো. নাসের বলেন, ইচ্ছৃকত খেলাপি চিহ্নিত হলে অনেক সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। তারা নতুন করে জমি বাড়ি গাড়ি কিনতে পারবেন না, এমনকি নতুন ব্যবসাও খুলতে পারবেন না।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য কর্মকর্তাদের ভাতা দেয়া হবে। এতে খেলাপি ঋণ আদায়ের গতি ফিরবে। আর ব্যাংকের নিজস্ব মূল্যায়নের পাশাপাশি তালিকাভূক্ত জামানত মূল্যয়নকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণের বিপরীতে উক্ত জামানত মূল্যায়ন করা হবে। এর ফলে অতিমূল্যায়িত জামানতের বিপরীতে ঋণ দেয়া বন্ধ করা যাবে। আর সঠিক জামানত থাকলে খেলাপি ঋণের অর্থ আদায় সহজ হবে।
সুশাসন ফেরাতে ৬ কর্মপরিকল্পনা
খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি ব্যাংক খাতের সুশাসন ফেরাতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর জন্য ছয়টি কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার পরিচালক নিয়োগে বর্তমান প্রক্রিয়া এবং দায়িত্ব ও কর্তব্য নীতিমালা হালনাগাদ করা। স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগে সম্মানী নির্ধারণ। তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কেও নীতিমালা। আর ব্যাংক নির্বাহীদিরে নিয়োগ ও পুনঃনিয়োগের ক্ষেত্রে বাছাই প্রক্রিয়া পরিবর্তন আনা হয়েছে। তাদের পদে কর্ম মূল্যায়নে পারফরম্যান্স যুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া এক গ্রাহক ঋণসীমা অতিক্রম না করার বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হয়। কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকে সব ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা হবে। আগামী ২০২৫ সালের ব্যাংকগুলোর পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে দূর্বল ব্যাংক চিহ্নিত করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই পদক্ষেপের কারণে পরিচালনা বোর্ড শক্তিশালী হবে, ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দূর হবে এবং প্রশাসনিক ব্যয় কমে আসবে। অন্যদিকে ব্যাংক কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে মৌলিক প্রশিক্ষণ এবং ব্যাংকিং প্রফেশানল পরীক্ষা পাশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।