আইএমএফের শর্ত বাস্তবায়নের রোডম্যাপ
- ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে ব্যাংক খাতে খেলাপি নামিয়ে আনা হবে ৮ শতাংশে।
- সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ১০ শতাংশ আর বেসরকারি ব্যাংকের ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার তাগিদ।
- ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চত করে বেনামী, স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ও জালিয়াতির ঋণ শূণ্যে নামিয়ে আনতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক।
নানা ধরনের ছাড় দিয়েও দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ কমাতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। বরং এসব ছাড়ের সুযোগ পেয়ে খেলাপি ঋণ আরও বেড়েছে। অথচ, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশকে ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে ব্যাংক খাতের খেলাপিকে ৮ শতাংশ নিচে নামিয়ে আনতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ১০ শতাংশ আর বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার শর্তও রয়েছে।
এজন্য ব্যাংক খাতে খেলাপি কমাতে ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের ধরতে ১১ দফা রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে ব্যাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে আরও ৬ দফাও ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও এই রোডম্যাপ বাস্তবায়ন হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কার রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু ফরাহ মোহা. নাসের বললেন, এর আগেও আমরা খেলাপি কমাতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। কিন্তু খেলাপি সেই অর্থে কমেনি। তবে এই রোডম্যাপের মাধ্যমে খেলাপি কমে আসবে বলেও মনে করেন তিনি।
গতকাল রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদের ৪২৩ তম সভায় এসব কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। পরিচালক পর্ষদ তা অনুমোদনও দিয়েছে। পরিচালক পর্ষদের সভা শেষে এসব বিষয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু ফারহ নাছের।
ডেপুটি গভর্নর বলেন, ২০২০ সালের জুলাই মাসে ব্যাংক খাতে খেলাপি কমাতে আমরা ২-৩০ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়েছিলাম। সে সময়ও ব্যাংক খাতে তারল্য সংকট ছিলো। এই সুবিধা দেওয়ায় ব্যাংক খাতে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ফিরে এসেছিলো। এতে তারল্য সংকট কিছুটা কমেছে। যদিও এই পদক্ষেপে খেলাপি তেমন কমেনি বলেও জানিয়েছেন তিনি। পুনঃতফসিলের সিদ্ধান্তে খেলাপি না কমলেও নতুন রোডম্যাপের মাধ্যমে খেলাপি কমবে বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই শীর্ষ কর্তা।
তিনি বলেন, খেলাপিদের ধরতে বাংলাদেশ ব্যাংক সব ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। বিশেষ করে আগে খেলাপিদের চিহ্নিত করা হলেও ইচ্ছাকৃত খেলাপি চিহ্নিত করা হতো না। এখন থেকে নিয়মিত ঋণ পরিশোধ না করলে তাকে ইচ্ছা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। এসব ঋণখেলাপিরা বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। তারা নতুন করে জমি বাড়ি গাড়ি কিনতে পারবেন না। নতুন ব্যবসাও খুলতে পারবেন না তারা।
আবু ফরাহ নাসের বলেন, ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ৮ শতাংশের নিচে নামানো হবে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশ এবং বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশে নিচে নামিয়ে আনা হবে। আর ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে সীমাতিরিক্ত, বেনামি স্বার্থ সংশ্লিষ্ট এবং জালিয়াতি অথবা প্রতারণার মাধ্যমে ঋণ বিতরণের পরিমাণ শূন্যে নামিয়ে আনা হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কারা দুর্বল ব্যাংক তাদের ক্রাইটেরিয়া বর্ণনা করে দিয়েছে। যদি কোন ব্যাংক ওই ক্রাইটেরিয়ার মধ্যে পড়ে তাহলে ব্যাংকের ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের বার্ষিক প্রতিবেদন ধরে ২৫ সালের মার্চে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংকের আমানত গ্রহণ, ঋন বিতরণসহ অনেক কার্যক্রম পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হতে পারে। এজন্যই আমরা অনেক আগে থেকেই ব্যাংকগুলোকে জানিয়ে দিয়েছি। যাতে তারা নিজেদের আর্থিক অবস্থান উন্নতি করতে পারে।
তবে যদিও কেউ উন্নতি করতে না পারে তাহলে অন্য ব্যাংকের সাথে মার্জ করে দেওয়াসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিবে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমরা চাই না কোন ব্যাংক খারাপ করুক বা কোন ব্যাংক দুর্বল হয়ে পড়ে।
হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে অনেক খেলাপি ব্যাংকের পরিচালক রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক কোন পদক্ষেপ নিবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কোর্টের আদেশের বাইরে গিয়ে কোন পদক্ষেপ নিতে পারে না। এটা সংবিধানে নেই। এজন্য কোন খেলাপির বিষয়ে যদি কোর্ট কোন আদেশ দেয় তাহলে আমরা পদেক্ষেপ নিতে পারবো না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, উন্নত দেশগুলোতে অর্থঋণের বিষয়ে হাইকোর্ট কোন সিদ্ধান্ত জানায় না। বাংলাদেশে এই ধরণের প্রেক্টিস থাকার কারণে খেলাপিরা এই সুযোগ নিচ্ছে। তাই খেলাপি কমাতে কোর্ট, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে এক সাথে কাজ করতে হবে। না হয় খেলাপিদের দৌরত্ব্য কমানো যাবে না।
নতুন রোডম্যাপ কতটা কার্যকর হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আইএমএফের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য নয়, দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে ও ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করতে নতুন এই রোডম্যাপের প্রয়োজন ছিলো। এখন দেখার বিষয় বাংলাদেশ ব্যাংক কতটা কার্যকর করতে পারে।
আর বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসব উদ্যোগ মূলত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কে দেখানোর জন্য। শর্ত পুরণ করতে না পারলেও তারা ব্যাংকগুলোকে কিছু বলে না। তবে খেলাপিদের ধরতে বাংলাদেশ ব্যাংক যে রোপম্যাপ দিয়েছে এটা ভালো। অতীতে এই রকম যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো সেগুলো ছিলো কাগুজে। এটাও কাগুজে হবে কিনা তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নে তারা সঠিক উদ্যোগ নিচ্ছে কিনা তার উপর।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক শক্ত হাতে কোন পদক্ষেপই বাস্তবায়ন করতে পারে না। যতটুকু শোনা যাচ্ছে অবলোপনের সময় কামানো হচ্ছে আবার ঋণ খেলাপির সময়সীমা ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৩ মাসে নামিয়ে আনা হচ্ছে। এগুলো করলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। খেলাপি ঋণ না কমে আরও বাড়বে। ব্যাংকগুলোকে কিছু করতে বললেই তারা সময়ক্ষেপন করে। এটা পুরোনো রোগ। এদেরকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসা দরকার।
খেলাপি কমাতে ১১ কর্মপরিকল্পনা
২০২৬ সালের মধ্যে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ৮ শতাংশে নিচে নামিয়ে আনতে মন্দঋণ অবলোপনের সময় ৩ বছর থেকে কমিয়ে ২ বছর করা হবে। এক্ষেত্রে শতভাগ প্রভিশন রাখতে হবে। শতভাগ প্রভিশন রাখলে ব্যাংকে ঝুঁকি থাকবে না বলে জানায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই পদক্ষেপের কারণে খেলাপি ঋণ ৪৩ হাজার ৩০ কোটি বা ২ দশমিক ৭৬ শতাংশ হ্রাস পাবে।
এছাড়া অবলোপন ঋণ আদায়ে ব্যাংক নির্বাহীদের সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ‘অবলোপনকৃত ঋণ আদায় ইউনিট’ নামে একটি পৃথক ইউনিট গঠন ও ঋণ আদায় নির্বাহীদের মূল্যয়ন যুক্ত করা হয়েছে। আর মন্দ ঋণ এবং অবলোপনকৃত সম্পদ বেসরকারি খাতে এ্যাসেস ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) নিকট বিক্রি করে ব্যাংক তাদের ব্যালেন্স শীট পরিস্কার করতে পারবে। এই অর্থ ব্যাংকের আয় খাতে জমা করতে পারবে।
খেলাপি ঋণ কমাতে অন্যতম কঠোর পদক্ষেপ হলো ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে প্রকৃত আদায় ছাড়া সুদ অথবা মুনাফা আয় খাতে নেয়া যাবে না। প্রকৃত আদয় না হওয়া পর্যন্ত আলাদা ব্যালেন্স শীটে রাখতে হবে। এর ফলে ব্যবস্থপনা কর্তৃপক্ষ নিয়মিত ঋণকে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ হতে দিবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ইতিপূর্বে ঋণ পরিশোধে বিভিন্ন ছাড় দেয়া হয়েছে। এসব ছাড়ের মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না। এতে করে ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি ফিরে আসবে এবং ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট কমে আসবে। আর ক্যাশ ফ্লো বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি পুরতান ঋণ আদায়ের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে নতুন ঋণের প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে।
অন্যদিকে মেয়াদি ঋণের মেয়াদোর্ত্তীণ হওয়ার সময় আন্তর্জাতিক চর্চায় ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সব ধরনের মেয়াদি ঋণ ওভারডিউ হওয়ার পর পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে ক্লাসিফাইড করতে হবে। যা বর্তমানে নয় মাসে করা হয়। এতে খেলাপি ঋণ কিছুটা বেড়ে যাবে বলে ধারণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
দেশের ব্যাংকগুলোর বিদ্যমান লিগ্যাল টিম অথবা আইন বিভাগকে শক্তিশালী করার কর্মপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে অর্থ ঋণ আদালতের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হবে আশা প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়া অর্থঋণ আদালতের পাশাপাশি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) পদ্ধতিতে আদালতের বাইরে মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হবে।
ইচ্ছকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী নীতিমাল প্রনয়ন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ নীতিমালর ফলে ঋণ গ্রহীতাদের ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ করার প্রবণতা হ্রাস পাবে । এ বিষয়ে ডেপুটি গভর্নর আবু ফারাহ মো. নাসের বলেন, ইচ্ছৃকত খেলাপি চিহ্নিত হলে অনেক সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। তারা নতুন করে জমি বাড়ি গাড়ি কিনতে পারবেন না, এমনকি নতুন ব্যবসাও খুলতে পারবেন না।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য কর্মকর্তাদের ভাতা দেয়া হবে। এতে খেলাপি ঋণ আদায়ের গতি ফিরবে। আর ব্যাংকের নিজস্ব মূল্যায়নের পাশাপাশি তালিকাভূক্ত জামানত মূল্যয়নকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণের বিপরীতে উক্ত জামানত মূল্যায়ন করা হবে। এর ফলে অতিমূল্যায়িত জামানতের বিপরীতে ঋণ দেয়া বন্ধ করা যাবে। আর সঠিক জামানত থাকলে খেলাপি ঋণের অর্থ আদায় সহজ হবে।
সুশাসন ফেরাতে ৬ কর্মপরিকল্পনা
খেলাপি ঋণ কমানোর পাশাপাশি ব্যাংক খাতের সুশাসন ফেরাতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর জন্য ছয়টি কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার পরিচালক নিয়োগে বর্তমান প্রক্রিয়া এবং দায়িত্ব ও কর্তব্য নীতিমালা হালনাগাদ করা। স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগে সম্মানী নির্ধারণ। তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কেও নীতিমালা। আর ব্যাংক নির্বাহীদিরে নিয়োগ ও পুনঃনিয়োগের ক্ষেত্রে বাছাই প্রক্রিয়া পরিবর্তন আনা হয়েছে। তাদের পদে কর্ম মূল্যায়নে পারফরম্যান্স যুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া এক গ্রাহক ঋণসীমা অতিক্রম না করার বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হয়। কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকে সব ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা হবে। আগামী ২০২৫ সালের ব্যাংকগুলোর পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে দূর্বল ব্যাংক চিহ্নিত করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই পদক্ষেপের কারণে পরিচালনা বোর্ড শক্তিশালী হবে, ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দূর হবে এবং প্রশাসনিক ব্যয় কমে আসবে। অন্যদিকে ব্যাংক কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে মৌলিক প্রশিক্ষণ এবং ব্যাংকিং প্রফেশানল পরীক্ষা পাশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।