নীতি সহায়তার নামে ঋণখেলাপি, অর্থপাচারকারীদের সহায়তা দেওয়া হয়েছে: ইআরএফ
আর্থিক খাতে শৃংখলা ধরে রাখতে কঠোর নীতির পরিবর্তে একের পর এক নীতি সহায়তার নামে ঋণখেলাপি, অর্থপাচারকারীদের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালে মেয়াদি ঋণ পরিশোধে বিশেষ ছাড় এবং ৯-৬ এর মতো নীতি গ্রহণ করে অর্থনীতিকে বিপর্যয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। শনিবার রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে দুরবস্থার কারণ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব বিষয় উঠে আসে।
ইআরএফ সভাপতি রেফায়েত উল্লাহ মীরধার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম। প্রবন্ধ উপস্থান করেন ইআরএফের জ্যেষ্ঠ সদস্য ওবাইদুল্লাহ রনি ও সানাউল্লাহ সাকিব।
প্রবন্ধে তারা জানান, বর্তমান সরকারের সময়ে পদ্মাসেতু, মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেলের মতো অনেক বড়-বড় প্রকল্প হয়েছে। এসব প্রকল্পের সুফল হিসেবে যেখানে কর্মসংস্থান বেড়ে মূল্যস্ফীতি নাগালের মধ্যে থাকার কথা। তবে ডলার সঙ্কট, ব্যাংক খাতে দূরবস্থার কারণে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষকে চরম অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। সরকারের সব অর্জন যেন এই উচ্চ মূল্যস্ফীত এবং ব্যাংক খাতের দূরবস্থা ম্লান করে দিচ্ছে।
আর্থিক খাতে শৃংখলা ধরে রাখতে কঠোর নীতির পরিবর্তে একের পর এক নীতি সহায়তার নামে ঋণখেলাপি, অর্থপাচারকারীদের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালে মেয়াদি ঋণ পরিশোধে বিশেষ ছাড় এবং ৯-৬ এর মতো নীতি গ্রহণ করে অর্থনীতিকে বিপর্যয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। দেশের মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার পরস্থিতি এবং ব্যাংক খাতে বিশৃংখলার বিষয়টি সবার জানা। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার কাজে ব্যর্থ হয়েছে বলে বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ বলেছেন। আবার যথাসময়ে সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ে সবাই এখন অস্বস্তিতে আছে। সর্বশেষ সদ্য বিদায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি ঠেকেছে ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। গত ১৩ বছরের মধ্যে যা সর্বোচ্চ।
দেশে উচ্চ মল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে কৃত্রিমভাবে ডলারের দর ৮৪-৮৬ টাকায় ধরে রেখেছিল। তবে করোনা পরবর্তী বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধি এবং রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের পর তা আর ধরে রাখা যায়নি। শুরুর দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা উপায়ে ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করে ডলারের দর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। ২০২২ সালের আগস্টে কয়েকটি ব্যাংকের ট্রেজারি হেডকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এমডিদের ব্যাখ্যা তলব করা হয়। এরপর ব্যাংক খাতে আতঙ্ক ছড়িয়ে ডলার বাজার আরও খারাপ হয়। ডলারের দর উঠে যায় ১১০ টাকায়। একদিকে বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, একই সঙ্গে দীর্ঘদিন কৃত্রিমভাবে ডলারের দর ধরে রাখার প্রভাবে টানা দু'বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। আবার ধারাবাহিকভাবে রিজার্ভ কমে ২০২১ সালের আগস্টের ৪৮.০৬ বিলিয়ন থেকে এখন ২৬ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। তবে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ১৫ বিলিয়নে নেমেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম একটি কারণ ডলার সঙ্কট। অথচ অর্থপাচারকারী, মানি লন্ডারিংয়ের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।
বেনামি ঋণসহ বিভিন্ন কারণে কয়েকটি ব্যাংকের ভঙ্গুর অবস্থার তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। বর্তমানে শরীয়াহ ভিত্তিক ৫টিসহ ৭টি ব্যাংক বিধিবদ্ধ তারল্য সংরক্ষণ তো দূরে থাক, দীর্ঘদিন ধরে চলতি হিসাবে ঘাটতি নিয়ে চরছে। গত মে পর্যন্ত এসব ব্যাংকের ঘাটতি ছিল প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা। চলতি হিসাব ঋনাত্বক রেখে কোনো ব্যাংক লেনদেন করতে পারার কথা না। অথচ ব্যাংকগুলোকে বিশেষ উপায়ে লেনদেন করতে দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এমনকি নতুন ঋণ বিতরণও অব্যাহত আছে। একই সঙ্গে এসব ব্যাংকের অর্ধ-বার্ষিক ও বার্ষিক প্রতিবেদন ভালো দেখাতে জুন ও ডিসেনর শেষে ঘাটতির চেয়ে বেশি জামানতবিহীন বিশেষ ধার দেওয়া হচ্ছে। এই প্রবণতা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির বিপরীতমুখী অবস্থান হিসেবে দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন বেশ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে না পারার বিষয়টি সবার জানা।
বর্তমান গভর্নর যোগদানের পরই এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দেন ১০টি দূর্বল ব্যাংক আলাদাভাবে নিবিড় তদারকি করা হবে। এসব ব্যাংকে নির্বাহী পরিচালক পর্যায়ের একজন করে কর্মকর্তাকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ ৩৬ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা বেড়ে গত মার্চ শেষে ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা হয়েছে। মোট ঋণের যা ১১ দশমিক ১১ শতাংশ। কাগজে-কলমে এটা দেখানো হলেও প্রকৃত খেলাপি ঋণ প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা বলে বিভিন্ন বক্তব্যে উঠে আসছে। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে নানা ছাড় দিয়ে কম দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে।
বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ বেশ আগ থেকেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সুদহার বৃদ্ধি ও সংকোচনমুলক মুদ্রানীতির ভঙ্গি গ্রহণ করে এরই মধ্যে সুফল পেতে শুরু করেছে। বেশ আগ থেকেই অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকারসহ বিভিন্ন পর্যায় থেকে বাংলাদেশের সুদহার বাজারভিত্তিক করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে বর্তমান গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২২ সালের আগস্টে সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, 'আউট অব বক্স' সিদ্ধান্ত নিয়ে তিন মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা হবে। ওই বছরের নভেম্বর- ডিসেম্বরের মধ্যে ডলার পরিস্থিতি ঠিক হয়ে আসবে। তবে প্রায় দুই বছর পরও উন্নতি তো দূরে থাক, আরও অবনতি হয়েছে। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাংলাদেশে বাড়ছে। যখন বৈশ্বিক রেটিং সংস্থা বাংলাদেশের মান অবনমন করে দিয়েছে, তখন গর্ভনর বলেছেন, এটা রাজনৈতিক কারণে কমানো হয়েছে।
অন্য দেশ যেখানে কঠোর নীতি থেকে সরে আসার অপেক্ষায় আছে, বাংলাদেশ সেখানে কঠোর নীতি গ্রহণ করে চলেছে। গত ৮ মে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একই দিন অর্থনীতির তিনটি কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আইএমএফের চাপে পড়ে ওই দিন সুদহার বাজারের ওপর ছেড়ে দিয়েছে, ডলারের দর ৭টাকা বাড়িয়ে ১১৭ টাকা মধ্যবর্তী দর ঠিক করেছে এবং নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে।