বন্ডের সুদহার ১৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ
- বন্ডের অতিরিক্ত সুদে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বেসরকারি খাত
- ২০ জুন ১৫.৮০% সুদে ৬২৭০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার
অধিক সুদের আশায় ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে ব্যাংক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি বিনিয়োগকারিরা। ১০ বছর মেয়াদী বন্ডের সুদহার এখন সর্বোচ্চ ১৫.৮০ শতাংশ পর্যন্ত, যা ১৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হওয়ার কারণে ক্রমেই বাড়ছে বন্ডে বিনিয়োগের পরিমাণ। মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারকে ঋণ দেওয়া কমালে বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সরকারের ঋণ নেওয়া বাড়তে থাকে। এদিকে ক্রমবর্ধমান সুদহারের কারণে ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার চেয়ে বিল ও বন্ডে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী। কারণ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ নিরাপদ, কিন্তু ঋণ বিতরণ করলে তা মন্দ হওয়ার আশংকা থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২০ জুন ১০ বছর মেয়াদি বন্ডে সুদহার বেড়ে ১৫ দশমিক ৮০ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছে। এই সুদে ৬ হাজার ২৭০ কোটি টাকা নিয়েছে সরকার। তবে পুরো ঋণ একই সুদহারে নিতে পারেনি। এক্ষেত্রে ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশ থেকে ১৫ দশমিক ৮০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ গুণতে হয়েছে। কিন্ত গত ডিসেম্বর মাসেও ১০ বছর মেয়াদী এই বন্ডের সুদের হার ছিল ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
এদিকে ১৫ বছর মেয়াদি বন্ডে সুদ উঠেছে ১৫ দশমিক ২০, এবং ২০ বছর মেয়াদী সুদের হার ছিল ১৫ দশমিক ৮০ শতাংশ পর্যন্ত।
এবিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধতন কর্মকর্তা জানান, ইদানিং ব্যাংকসহ প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ডে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। কারণ এই খাতে সুদের হার ক্রমেই বাড়ছে। আর বন্ডের মতো নিরাপদ বিনিয়োগ আর নেই। ঋণ বিতরণের পর খেলাপি হওয়ার শঙ্কা এখানে একেবারেই নেই। ২০০৭ সালের দিকে বন্ডের সুদহার ১৫ শতাংশ ছাড়িয়েছি। এরপর থেকে কমতে থাকে। তবে, বাংলাদেশ ব্যাংক এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রধান অগ্রাধিকার দিয়ে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির পথ অনুসরণ করছে। সুদহার বাড়িয়ে একদিকে মানুষের হাতের টাকা ব্যাংকে ফেরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, অন্যদিকে খরচ বাড়িয়ে চাহিদা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। এরফলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বন্ডে স্থানান্তরিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২ বছর মেয়াদী ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার ১২ থেকে ১৪.৯০ শতাংশ, ৫ বছর মেয়াদী বন্ডের সুদহার ১২.৩০ থেকে ১৫.৩০, ১০ বছর মেয়াদী বন্ডের সুদহার ১২.৫৪ থেকে ১৫.৮০, ১৫ বছর মেয়াদী বন্ডের সুদহার ১২.৬০ থেকে ১৫.২০ এবং ২০ বছর মেয়াদী বন্ডের সুদহার ১২.৫৯ থেকে ১৫.৫০ শতাংশ।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আমিন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারকে দীর্ঘদিন থেকে কোন ধরনের ঋণ দিচ্ছে না। এজন্য ব্যাংকগুলো সরকারি বিল-বন্ড ক্রয়ের ক্ষেত্রে চাহিদা অনুযায়ী সুদের হার বাড়িয়ে নিচ্ছে। এতে একদিকে সরকারের যেমন সুদ ব্যয় দিনদিন বাড়ছে। একই ভাবে বেসরকারি খাতের ছোট উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছে না। কারণ ব্যাংক নিরাপদ খাত হিসেবে তার বেশির ভাগ অর্থই বেশি সুদের বিল-বন্ডে বিনিয়োগের চেষ্টা করছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের ছোট উদ্যোক্তারা উৎসাহ হারাবে। আর কর্মসংস্থান তৈরির পথ রুদ্ধ হবে।
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে শহরাঞ্চলের বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক টাকা না রেখে বিল বন্ডে বিনিয়োগ শুরু করেছে। সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি না করে বিল বন্ডের অর্থে নজর থাকলে সাধারণ মানুষের এই খাতে বিনিয়োগের হার বাড়বে। এতে ব্যাংক আমানতেও প্রভাব তৈরি করতে পারে। যদিও এখন পর্যন্ত ওই ধরনের পরিবেশ তৈরি হয়নি বলেও মনে করেন সাবেক এ ব্যাংকার।
দেশের উচ্চমূল্যস্ফিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য গত বছর থেকে সংকোচনমূলক নীতি গ্রহণ করেছে সরকার। এরপর থেকেই হু হু করে বাড়ছে ব্যাংকঋণের সুদের হার। সঙ্গে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহারও। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে এসব উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সে উদ্দেশ্য এখনও পুরন হয়নি। উল্টো মূল্যস্ফীতি দিন দিন বেড়েই চলেছে।
ব্যাংককাররা জানান, ব্যাংকিং খাতে তারল্যসংকট রয়েছে। কোনো কোনো ইসলামি ব্যাংক এক বছরের বেশি সময় ধরে তারল্যসংকটে ভুগছে। এর প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে। এছাড়া ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো বর্তমানে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।