আইন করে নিজেরাই মানে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক
- আইএফআইসি ব্যাংককে অবৈধ সুবিধা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক
- সদ্য সাবেক এমডিকে নিয়োগ করা হয়েছে উপদেষ্টা হিসেবে
- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা ব্যবহারের জন্য দরকার সৎ, যোগ্য ও সাহসী নেতৃত্ব- সালেহউদ্দিন আহমেদ, সাবেক গভর্নর
কোনো ব্যাংকের পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের চাকরি অব্যাহতির কমপক্ষে পাঁচ বছর একই ব্যাংকে উপদেষ্টা বা পরামর্শক নিযুক্ত করা যাবে না বলে নীতিমালা জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অথচ, বেসরকারি খাতের আইএফআইসি ব্যাংকের সদস্য সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মাদ শাহ আলম সরোয়ারকে ব্যাংকটির উপদেষ্টা হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটা নীতিমালা করার পর যখন সেই নীতিমালা বাস্তবায়ন না হয় তখন এর নেতিবাচক প্রভাব বিভিন্ন জায়গায় পড়ে।
তথ্য বলছে, ২০২১ সালের ২১ মে ব্যাংকের পরিচালক, চুক্তিভিত্তিক উপদেষ্টা ও পরামর্শক নিযুক্তির বিধি বিধান প্রসঙ্গে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যেখানে বলা হয়েছে, ব্যাংক-কোম্পানীর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় নিরপেক্ষতা, পেশাগত মান ও সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যাংক কোম্পানী আইন, ১৯৯১ এর ১৫(৯) ধারায় ব্যাংক-কোম্পানীর সাথে অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যৎ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের যোগ্য হবেন না মর্মে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। আইনের ওই বিধান অনুযায়ী ব্যাংক- কোম্পানীর সাবেক পরিচালক বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা অন্য কোনো কর্মকর্তা নিয়মিত বা চুক্তি ভিত্তিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হতে পারেন না।
নীতিমালায় আরও বলা হয়, ব্যাংক কোম্পানী আইন, ১৯৯১ এর ১৫ (৯) ধারার উদ্দেশ্য অনুযায়ী ব্যাংক-কোম্পানীর পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় নিরপেক্ষতা, পেশাগত মান ও সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ব্যাংক-কোম্পানীর পরিচালক, চুক্তিভিত্তিক উপদেষ্টা বা পরামর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
ব্যাংক-কোম্পানীর সাবেক পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা প্রধান নির্বাহীর নিচের অব্যবহিত দুই স্তর পর্যন্ত কর্মকর্তা অবসর বা অব্যাহতি বা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পাঁচ বছর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত একই ব্যাংকের উপদেষ্টা বা পরামর্শক হিসেবে নিযুক্ত হতে পারবেন না। নিয়মিত বা চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা অবসর বা অব্যাহতি বা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কখনোই একই ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার যোগ্য হবেন না।
কিন্তু সেই নীতিমালা উপেক্ষা করে আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মাদ শাহ আলম সরোয়ারের মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মাথায় আবারও তাকে একই ব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, বিশেষ বিবেচনায় তাকে নিয়োগ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, এভাবে নিয়োগ দেওয়া হলে ব্যাংকিং খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ব্যাংকেরও এমডি বলেন, কোনো কর্মকর্তা যখন দীর্ঘদিন ধরে এক জায়গায় থাকেন ওখানে স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রভাব পড়ে। যেখানে লাইট থাকবে সেখানে মোমবাতির আলো কাজ করবে না। এছাড়াও ব্যাংক সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ইতিবাচক নেতীবাচক কোন প্রভাব পড়ে সেটাও চিন্তা কার উচিত। সবথেকে বড় কথা হচ্ছে সবার তো বয়স বাড়ছে। একসময় জায়গাটা যদি আমি খালি করে না দেই এটা শুধু ব্যাংকের জন্যই নয়, যে কোনো ক্ষেত্রেই নেত্রিত্ব তৈরিতে বাধাগ্রস্ত হবে। দেশের জন্য লিডারশিপ তৈরি হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেদের নির্দেশনা ভঙ্গ করে কিভাবে উপদেষ্টা নিয়োগের অনাপত্তি দিয়েছে জানতে চাইলে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, সম্প্রতি ব্যাংকটি বিভিন্ন খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগে ব্যাংকটির তাকে প্রয়োজন। এজন্য তাকে উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের জন্য ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অনাপত্তি চেয়েছে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ বিবেচনায় উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের জন্য অনাপত্তি দিয়েছে।
বিষয়টি ব্যাংক খাতে কি ধরণের বার্তা দিবে এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ কালবেলাকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে তাদের নিজদের গুরুত্ব নিজেরাই নষ্ট করছে। তারা সার্কুলারদের আবার অল্প সময়ের মধ্যে তা পরিবর্তন করে। আবার নিজেদের সার্কুলার নিজেরাই মানছে না। এটা খুবই দুঃখজনক। স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। এই ক্ষমতা ব্যবহারের জন্য দরকার সৎ, যোগ্য ও সাহসী নেতৃত্ব। আর্থিক খাতের অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে সরকারকে এই দিকে অবশ্যই নজর দিতে হবে।