ডলার কারসাজিতে চ্যাম্পিয়ন পূবালী ব্যাংক
- অতিরিক্ত দরে ডলার বিক্রি করে আয় ২৪৮ কোটি
- অতিরিক্ত দরে ডলার ক্রয় করে ব্যয় ২১১ কোটি
- ডলার কারসাজিতে জড়িত থেকে পায়নি শাস্তি
দেশের ডলার বাজারের অস্থিরতা গত ২ বছর যাবৎ। মার্কিন এই মুদ্রার সংকটের সুযোগে বিভিন্ন সময় ডলার কারসাজি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। আবার এই অপরাধে ধরা পড়ে শাস্তির মুখেও পড়তে হয়েছে বিভিন্ন ব্যাংককে। যদিও পরে সেইসব শাস্তি মওকুফ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে ডলার কারসাজিতে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেও কোন শাস্তির মুখে পড়তে হয়নি বেসরকারি খাতের পূবালী ব্যাংককে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নরের কৃপায় বেঁচে গেছে ব্যাংকটি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি পরিদর্শন প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফেদা) ঘোষিত দরের বেশি দরে ডলার বিক্রি করে ২৪৮ কোটি টাকা আয় করেছে বেসরকারি খাতের পূবালী ব্যাংক। একই সময়ে বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে বেশি দরে ডলার ক্রয় করে অতিরিক্ত ২১১ কোটি টাকা ব্যয় করেছে ব্যাংকটি। আয়ও ব্যয়ের অতিরিক্ত অর্থের হিসাবায়নের জন্য ব্যাংকটি কয়েকটি সাস্পেন্স একাউন্ট ব্যবহার করেছে। লক্ষ্য ছিলো লেনদেন শেষে এই অ্যাকাউন্টগুলো ডিলিট করে দিবে। কিন্তু তার আগেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন দলের হাতে ধরা পড়ে বিষয়টি। এরপর পরিদর্শন দল অ্যাকাউন্টগুলোর বিস্তারিত তথ্য চেয়ে চিঠি দিলেও বাধে বিপত্তি।
এই বিপত্তি থেকে বাঁচতে ব্যাংকের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নরকে ম্যানেজ করে তদন্ত সেখানেই থামিয়ে দেওয়া হয়। এই অনিয়ম শুধুমাত্র একটি শাখার। অন্যান্য এডি শাখাগুলোতে পরিদশন করতে চাইলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উর্ধ্বতনরা তা করতে দেয়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন টিমের বিশেষ পরিদর্শনে দেখা যায়, পূবালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে কেন্দ্রীভূত বাণিজ্য প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট কর্তৃক বৈদিশক মুদ্রার নির্ধারিত হার করা হলেও গ্রাহক থেকে আমদানির বিল বাবদ অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করে। এতে ব্যাংকটি আমদানিকারকদের নিকট হতে আমদানি বিল বাবদ ঘোষিত হারের চেয়ে অতিরিক্ত ১৪৮ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। পূবালী ব্যাংকের এসব গ্রাহক হতে প্রাপ্ত অতিরিক্ত অর্থ মতিঝিল ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখার একাধিক হিসাবে স্থানান্তর করে। যাতে বিদেশী এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর অনুমোদন না নিয়েই সাতটি হিসাব খোলা হয়।
একই সময়ে ব্যাংকটি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন এক্সসেঞ্জ হাউজ থেকে বাজার নির্ধারিত দরের চেয়ে উচ্চমূল্যে বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয় করেছে। এতে ব্যাংককের একটি এডি শাখার মাধ্যমেই বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয় বাবদ ২১১ কোটি টাকা অতিরিক্ত প্রদান করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পূবালী ব্যাংকের এসব অনিয়ম পাওয়ার পর অন্যান্য শাখাগুলোতে বিস্তর পরিদর্শন চান বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন টিম। যদিও একজন ডেপুটি গভর্নর নতুন করে পরিদর্শন আটকে দেন। একইসঙ্গে ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোন ধরণের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ কারাও হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্টে বলা হয়, এক্সচেঞ্জ হাউজের নামে খোলা পূবালী ব্যাংকের সাতটি হিসাবের মধ্যে এমডি (চলতি দায়িত্ব) কর্তৃক অনুমোদন নিয়েছেন। এছাড়া বাকি তিনটা কার অনুমোদনের খোলা হয়ছে তা স্পষ্ট নয়।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, পূবালী ব্যাংক ঘোষিত দরের চেয়ে বেশি দরে এক্সচেঞ্জ হাউজ থেকে ডলার কেনার ক্ষেত্রে উচ্চ মূল্য পরিশোধ করে। এতে সরকারের ৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা অপচয় করেছে, যা রেমিট্যান্সের প্রণোদনা হিসেবে দেওয়া হয়েছিলো।
পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী নতুনধ্বনিকে বলেন, পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, পূবালি ব্যাংক এসব অনিয়ম সংগঠিত হওয়ার সময় বাফেদা ঘোষিত ডলার দর ছিলো ১০৯ টাকা থেকে ১১০ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু ব্যাংকটি ওই সময় ১১৩ টাকা থেকে ১২৩ টাকা ৬০ পয়সায় ডলার কিনেছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, পুবালী ব্যাংকের শুধুমাত্র একটি শাখায় এমন অনিয়ম পাওয়া গেছে। ব্যাংকের অন্যন্য এডি শাখগুলোতে পরিদর্শন করলে আরোও কয়েকগুন অনিয়ম পাওয়া যাবে মর্মে প্রতিয়মান হয়।’
যেসব এক্সচেঞ্জ হাউজের নামে অতিরিক্ত ডলার মুল্য লেনদেন হয়েছে:
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে পূবালী ব্যাংকের যে সাতটি অ্যাকাউন্টে ডলারের অতিরিক্ত মুল্য লেনদেন হয়েছে সেগুলো হলো:
অ্যারাবিয়ান এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে ১ কোটি ৫২ লাখ ডলার রেমিট্যান্স কিনেছে পূবালী ব্যাংক। এ সময় বাজারের দর ১০৯.৫০ থেকে ১১০ টাকা হলেও ব্যাংকটি ডলার কিনেছে সর্বোচ্চ ১১৭ টাকায়। এতে ব্যাংকটিকে অতিরিক্ত ৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।
মার্চেনট্রেডকে ৫ কোটি ৫২ লাখ ডলার রেমিট্যান্সে সর্বোচ্চ ১২৩ টাকা পর্যন্ত দর দিয়েছে ব্যাংকটি। যার কারণে অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হয়েছে ৪০ কোটি টাকা।
গালফ ওভারসিজ এক্সচেঞ্জকে ৪ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের বিপরীতে ব্যাংকটি সর্বোচ্চ রেট দিয়েছে ১২২ টাকা, যার বিপরীতে অতিরিক্ত পরিশোধ করেছে ২৬ কোটি টাকা।
পূবালী ব্যাংক ইউনিভার্সাল এক্সচেঞ্জ সেন্টার থেকে ৭৭ লাখ ডলার কিনেছে সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৫০ পয়সা দরে। এতে অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হয়েছে ৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা।
এনবিএল মানি ট্রান্সফারের মাধ্যমে ৪৫ লাখ ডলার কিনেছে ব্যাংকটি। এতে সর্বোচ্চ দর ছিল ১১৭ টাকা ৫০ পয়সা, যার কারণে ২ কোটি ৪২ লাখ টাকা অতরিক্ত পরিশোধ করতে হয়েছে।
ব্যাংকটি কন্টিনেন্টাল এক্সচেঞ্জ সলিউশনস-এর (আরআইএ) মাধ্যমে ১০ লাখ ৬০ হাজার ডলার কিনেছে। এতে সর্বোচ্চ রেট ছিল ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা, যার বিপরীতে অতিরিক্ত খরচ হয়েছে ১১০ কোটি টাকা।
এছাড়া মাল্টিনেট ট্রাস্ট এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে ৫ কোটি ৮৬ লাখ দিরহাম রেমিট্যান্স কিনেছে পূবালী ব্যাংক। এতে নির্ধারিত রেট ছিল ৩০ টাকা ০৮ পয়সা। কিন্তু ব্যাংকটি রেমিট্যান্স কিনেছে সর্বোচ্চ ৩৩ টাকা ২১ পয়সা দামে। এতে বাড়তি খরচ হয়েছে ১৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে আরও বলা হয়েছে, পুবালী ব্যাংক বিভিন্ন শাখার মাধ্যমে আমদানিকারকদের নিকট থেকে বিলমুল্য বাবদ ঘোষিত দরের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ মতিঝিল ফরেন এক্সচেঞ্জ শাখার ৭টি হিসাবের বাহিরেও ব্যাংকের অন্যন্য শাখার ভিন্ন ভিন্ন হিসেবে এমনকি বিভিন্ন গ্রাহকের হিসাবে স্থানন্তর করা হয়েছে।
এর মাধ্যে পুবালী ব্যাংকের বরিশালের হসপিটাল রোড শাখা একটি এলসির বিপরীতে ৫৬ হাজার ৮৫০ টাকা আদায় হয়েছে তার তথ্য রয়েছে। এছাড়া এমন লক্ষ লক্ষ্য ট্রেনজেকশন হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে একজন বলেন, পূবালী ব্যাংকের সঙ্গে শরিমিন গ্রুপের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ব্যাপক পরিমাণে লেনদেনের হিসাব রয়েছে। এসব অনিয়মে বিস্তর পরিদর্শনের কথা বললেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নর এ বিষয়ে আর পরিদরশন করতে দেননি।
এর আগে, ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমতে থাকায় ও আমদানি দায় বেড়ে যাওয়ায় ডলারের সংকট তৈরি হয়। তখন ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্স, আমদানি ও রপ্তানির ক্ষেত্রে ডলারের ভিন্ন ভিন্ন দর নির্ধারণ করে। যার পেক্ষিতে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবিবি ও বাফেদাকে ডলারের রেট নির্ধারণের ক্ষমতা দেন।
এরপর থেকে সংগঠন দুটিই ডলারে দর নির্ধারণ করার দায়িত্বে ছিলো। তবে গত বুধবার ক্রলিং পেগ ঘোষণার মাধ্যমে ডলারের দর নির্ধারণের দায়িত্ব আরও নিজের হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে ডলার নতুন দর ১১৭ টাকা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আমিন বলেন, ডলার সংকটের সুযোগে কেউ যদি কারসাজি করে থাকেন তাহলে বুঝতে হবে তার নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনারও ব্যত্যয়। সুতরাং যারা এ ধরনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা উচিত। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক কয়েকটি ব্যাংককে শান্তির আওতায় এনেও তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। এটা ঠিক হয়নি।
তিনি আরো বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সব ব্যাংককেই সমানভাবে মূল্যায়ন করা দরকার। কেউ যদি অন্যায় করেও পার পেয়ে যায় তাহলে তা ব্যাংকগুলো ভুল বার্তা দিবে। অন্য ব্যাংকও অন্যায়ে উদ্বুদ্ধ হবে। তাই নীতি সবার জন্য একই হওয়া উচিত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী বলেন, এটা ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদন। সেখানে এ ধরনের একটি অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু পূবালী ব্যাংক কখনো আইনের বাইরে কাজ করে না। আমরা মার্কেট দর অনুযায়ী ডলার ক্রয় করেছি এবং বিক্রয় করেছি। পূবালী ব্যাংক অলওয়েজ কমপ্লায়েন্স।
নির্ধারিত দরের বেশি ধরে ক্রয়ের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কোন নির্ধারিত দর সে সময় দেয়নি। এ সম্পর্কে আপনাদের ধারণার ভুল রয়েছে। বিস্তারিত জানতে পিআরও সাথে যোগাযোগ করুন।