নিজ খেলাপি হয়েও অস্তিত্বহীন কোম্পানিকে সোয়া ৪০০ কোটি টাকা ধার

শিক্ষা বিস্তারের আড়ালে ভয়াবহ ঋণ জালিয়াতি স্কলাস্টিকার

  আকিব মাহমুদ
  প্রকাশিতঃ রাত ০১:২৫, সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১০ কার্তিক ১৪৩৩
ছবি: নতুন ধ্বনি
ছবি: নতুন ধ্বনি
  • স্কলাস্টিকার ৭৩০ কোটি টাকার ঋণের ৭২৭ কোটিই খেলাপি।
  • অস্তিত্বহীন ক্রিসেন্ট লিমিটেডকে সোয়া ৪০০ কোটি টাকা ঋণ।
  • ক্রিসেন্টের নেতৃত্বে নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রির দুই সাবেক কর্মকর্তা।
  • ক্রিসেন্টের ঠিকানায় মিলেনি বাড়ির অস্তিত্ব।
  • আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানকে ঘিরে সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন।

স্কলাস্টিকা, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক অভিজাত সংযোজন। পাঁচ দশক ধরে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা ও পেশাদারত্বের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি অর্জন করেছে নির্ভরযোগ্যতার উচ্চ আসন। প্রতিবছর উচ্চবিত্ত পরিবারের হাজারো শিশু-কিশোর এখানে শিক্ষাগ্রহণ করে। তবে শিক্ষার আলো ছড়ানো এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই উঠেছে বড় ধরনের ঋণ অনিয়মের অভিযোগ।

এটি স্কলাস্টিকা স্কুলের বনানী শাখা। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মানসম্মত শিক্ষা দিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। অথচ শিক্ষা বিস্তারের আড়ালে ঋণ অনিয়মে নাম জড়িয়েছে স্কলাস্টিকা লিমিটেডের।

আইএফআইসি ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত স্কলাস্টিকা লিমিটেডের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭২৭ কোটি টাকাই খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘমেয়াদে ৩১৯ কোটি টাকা এবং স্বল্পমেয়াদে ৩৭৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। যদিও স্কুলটির এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে।

স্কলাস্টিকা লিমিটেডের কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান জিয়া হাসান বলেন, “আমাদের ঋণ খেলাপি হয়েছিল। সেটা আমরা কোন পুনঃতফসিল করে ফেলেছি।” তবে ক্রিসেন্ট লিমিটেডের বিষয়ে তিনি অবগত নন বলেও জানান।

প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মিত উচ্চহারে ফি, মোটা অঙ্কের ভর্তি ফি ও জামানত আদায় করা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শত শত কোটি টাকা ব্যাংকঋণের প্রয়োজন পড়ল কেন? আর সেই টাকা কোথায় ব্যয় করা হয়েছে?

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নিজেরাই ব্যাংকঋণের দায়ে থাকা স্কলাস্টিকা বিপুল পরিমাণ টাকা ঋণ দিয়েছে অন্য একটি কোম্পানিকে। অথচ বাস্তবে ওই কোম্পানির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, ক্রিসেন্ট লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটিকে সোয়া ৪০০ কোটি টাকা দিয়েছে স্কলাস্টিকা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, “কোনো গ্রাহক যদি ঋণ গ্রহণ করেন, তার নির্দিষ্ট উল্লেখিত পারপাস ছাড়া অন্য কোনো খাতে একটি টাকাও ব্যয় করার কোনো প্রকার সুযোগ নেই। সেটা যদি মানে উৎপাদনশীল খাত হয়, তাতেও সুযোগ নেই।”

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ওয়ারেসুল করিম বলেন, “স্কলাস্টিকার কাছ থেকে কেউ দুর্নীতি বা জালিয়াতি আশা করে না। আইএফআইসি যদি করে থাকে এটা সম্ভাবনা, কারণ এখানে পুরো জিনিসটাও ওই যে স্কলাস্টিকার হয়তো নাম ইউজ করেছে, স্কলাস্টিকাকে হয়তো কোনো একটা কিছু সুবিধা দিয়েছে, কিছু কিছু টাকা পয়সা হয়তো স্কলাস্টিকাকেও দেওয়া হয়েছে।”

বাস্তবে অস্তিত্ব না থাকলেও নথিতে ক্রিসেন্ট লিমিটেডের কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসের (আরজেএসসি) নথি অনুযায়ী, সালাউদ্দিন খান মজলিস, আব্দুর রউফ ও গাজী মনিরুল ইসলাম ছিলেন কোম্পানিটির নেতৃত্বে। তাঁদের মধ্যে আব্দুর রউফ ছিলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাকি দুজন পরিচালক।

নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, আব্দুর রউফ ও সালাউদ্দিন খান মজলিস নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রি ছিল সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে সালমান এফ রহমান ছিলেন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান। ফলে ক্রিসেন্ট লিমিটেডের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার প্রশ্ন সামনে এসেছে।

ক্রিসেন্টের তিন ব্যক্তির খোঁজে অনুসন্ধানে নামে একাত্তর বিজনেস। আরজেএসসির নথিতে আব্দুর রউফের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ১ নম্বর সড়কের ৪৮ নম্বর বাড়ি। কিন্তু অনুসন্ধানে ওই এলাকায় এ নম্বরের কোনো বাড়ির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এমনকি সড়কটিতে জোড় সংখ্যার কোনো বাড়ি নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার নিরাপত্তাকর্মীরা।

৪৭, ৪৭/১ ও ৪৯ নম্বর বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী রহিম, জনি ও রুহুল আমিন জানান, ওই এলাকায় ৪৮ নম্বর কোনো বাড়ি নেই। তাঁদের দাবি, সিটি করপোরেশন থেকে এভাবেই বাড়িগুলোর ঠিকানা ও নম্বর দেওয়া হয়েছে।

গাজী মনিরুল ইসলামের ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মিরপুর-১-এর বেক্সিমকো রিয়েল এস্টেটের নিয়ন্ত্রণাধীন মুন্সী লেকভিউ অ্যাপার্টমেন্টের ৮/২ নম্বর ভবন। তবে অনুসন্ধানে ওই এলাকায় এ ধরনের কোনো ভবনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। যদিও বি-২ ভবনে গাজী মনিরুল ইসলাম নামে একজনের বসবাসের তথ্য পাওয়া গেছে, তিনি সরকারি চাকরি করতেন। বি-২ ও সি-১ ভবনের নিরাপত্তাকর্মীরাও জানান, উল্লেখিত নম্বরে ওই এলাকায় কোনো বাড়ি নেই।

এ ছাড়া ক্রিসেন্ট লিমিটেডের পরিচালক সালাউদ্দিন খান মজলিসের ইস্কাটন প্লাজার বাসায় গিয়ে তাঁর বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে নিরাপত্তাকর্মী জানান, তিনি আর বেঁচে নেই। সে সময় তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও বাসায় পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্কলাস্টিকা স্কুল ও এর মূল গ্রুপ অব কোম্পানি অ্যাসেন্টের শুভাকাঙ্ক্ষী ও সেবাগ্রহীতা ছিলেন সালমান এফ রহমান ও বেক্সিমকো। অর্থাৎ স্কলাস্টিকার মালিকদের সঙ্গে সালমান এফ রহমানের পরোক্ষ সম্পর্ক ছিল। অন্যদিকে তাঁর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা ছিলেন স্কলাস্টিকার কাছ থেকে সোয়া ৪০০ কোটি টাকা পাওয়া কোম্পানি ক্রিসেন্ট লিমিটেডের নেতৃত্বে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. এজাজুল ইসলাম বলেন, “ব্যাংক যে অর্থে ফাইন্যান্স করল, তাকে আবার ওইটা ওইটা না নিয়ে তো আবার অন্য জায়গায় কাজে লাগালো, এইটা কিন্তু অনেক দিন ধরে এইটা হচ্ছে আর কি কম ছোট আকারে বড় আকারে। তবে এইটা একটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ, বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলেই উনাদের শাস্তির আওতায় আনতে পারে।”

অর্থনীতিবিদ ও পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. এম মাশরুর রিয়াজ বলেন, “এটার আল্টিমেট ইকোনমিক বেনিফিটটাও ডিফারেন্ট হতে পারে, সুতরাং এই জায়গাটাতেও আমার মনে হয় একটু এই গভর্নেন্স ইম্প্রুভমেন্টের সময় ফোকাস করা প্রয়োজন।”

স্কলাস্টিকা স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও কূটনীতিক ইয়াসমিন মুর্শেদ। ২০২৩ সালে তাঁর মৃত্যুর পর থেকে স্কুলটি পরিচালনা করছেন তাঁর মেয়ে সৈয়দা মাদিহা মুর্শেদ।

এদিকে, আইএফআইসি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি। ব্যাংকটির কাছ থেকে ঋণ নেওয়া স্কলাস্টিকা লিমিটেডের ৭৩০ কোটি টাকার দায়ের মধ্যে ৭২৭ কোটি টাকা খেলাপি হওয়ার তথ্য এবং অস্তিত্বহীন ক্রিসেন্ট লিমিটেডকে সোয়া ৪০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার বিষয়টি আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ঋণের অর্থের ব্যবহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতের বাইরে ব্যবহার এবং আর্থিক সুশাসনের ঘাটতি প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

Share This Article